আল জাজিরা ‘সূত্র’ সামি খানের সাথে সরকারের ইতিহাস

বাংলাদেশ

সামি খান: আল জাজিরার অনুসন্ধানের মূল সূত্র
হাঙ্গেরি প্রবাসী ব্যবসায়ী সামি খান সম্প্রতি বাংলাদেশে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছেন। কাতার-ভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল জাজিরা, বাংলাদেশের সেনা প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং তার ভাইদের নিয়ে যে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচার করেছে, তার মূল সূত্র ছিলেন সামি খান। প্রতিবেদনের জবাবে আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ দফতর বা আইএসপিআর মি. খানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উপস্থান করেছে।

ফেব্রুয়ারি মাসের পহেলা তারিখে আল-জাজিরার প্রতিবেদন প্রচার হবার এক দিন পরেই এক বিবৃতিতে আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ দফতর বা আইএসপিআর সামি খানকে ”মাদকাসক্তির অপরাধে বাংলাদেশ মিলিটারি এ্যাকাডেমি হতে বহিষ্কৃত একজন ক্যাডেট” বলে আখ্যায়িত করে।তার দু’সপ্তাহ পরে ফেব্রুয়ারি মাসের ১৬ তারিখে প্রকাশিত আরেকটি বিবৃতিতে আইএসপিআর সামি খানের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ আরো বিস্তৃত করে বলে, ২০০৬ সালে সকল ক্যান্টনমেন্টে তাকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করা হয়েছিল।

”সামিকে ইতিপূর্বে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মিলিটারি পুলিশ কর্তৃক চুরি, সেনাবাহিনীর অফিসারের পোশাক এবং ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করে প্রতারণার অপরাধে বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার করা হয়,” বিবৃতিতে বলা হয়। সামি খান স্বীকার করেন তাকে সামরিক এ্যাকাডেমি থেকে বহিষ্কার কর হয়েছিল – তবে সেটা মাদকাসক্তির জন্য নয়। ”আমাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল শৃঙখলা ভঙ্গের কারণে। বুদাপেস্টে ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে আলাপ করছেন সামি খান।

কিন্তু তার পরে বিভিন্ন সময়ে সামি খান বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সাথে কাজ করেছেন। বিশেষ করে, ওয়ার্ল্ড ওয়াটার সামিটের জন্য ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন হাঙ্গেরিতে আসেন, তখন সামি খান সফর দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন বলে তিনি জানান।

সামি খান বলছেন, ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় বাংলাদেশ দূতাবাস তাকে প্রধানমন্ত্রীর সফর সম্পর্কে জানায়। ”যেহেতু হাঙ্গেরিতে কোন বাংলাদেশ দূতাবাস নাই, তাই ওনারা আমাকে অনুরোধ করেন যাতে তাদের লজিস্টিকাল সহায়তা করি যেমন, মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য যোগাযোগের ব্যবস্থা, খাবার-দাবারের ব্যবস্থা ইত্যাদি।

প্রধানমন্ত্রীর সফরের সঙ্গে কাজ করার জন্য নিরাপত্তা যাচাই করার প্রশ্ন আছে। তাই এপ্রিল মাসে পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য তাকে তার পাসপোর্ট এবং হাঙ্গেরিয় রেসিডেন্স পারমিট ভিয়েনায় দূতাবাসে পাঠাতে বলা হয়। ”আমাদের বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় যদি কোন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকে, তাদেরকে এনএসআই, ডিজিএফআই এবং পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ থেকে ক্লিয়ারেন্স করাতে হবে।

”আমি যদি বিদেশি নাগরিক হতাম তাহলে সেই দেশের প্রতিষ্ঠানের ক্লিয়ারেন্সের প্রয়োজন হত। কিন্তু আমি যেহেতু বাংলাদেশি নাগরিক এবং আমি প্রধানমন্ত্রীর সফর দলের লজিস্টিকাল সাপোর্ট, খাবারের সাপোর্ট ইত্যাদি দেব, তাই আমার বাংলাদেশর তিনটি গোয়েন্দা সংস্থার ক্লিয়ারেন্স প্রয়োজন হয়েছিল।

তিনি বলেন প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী যেসব নিরাপত্তা কর্মী ছিলেন – এসএসএফ, ডিজিএফআই ইত্যাদি – তাদেরকে তিনি নিজ রেস্টুরেন্টে দাওয়াত দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ভিয়েনাস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস তার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে একটি প্রশংসাপত্রও পাঠিয়েছিল।

এখানে তাহলে প্রশ্ন আসে, যদি ২০০৬ সালে তাকে একজন অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে, তাহলে তার ১০ বছর পর প্রধানমন্ত্রীর সফরের মত একটি অতি স্পর্শকাতর কার্যক্রমে যুক্ত থাকার জন্য তাকে তিনটি গোয়েন্দা সংস্থা কীভাবে ক্লিয়ারেন্স দেয়? ”আমি যদি সেরকম চোর বা প্রতারক হতাম, তাহলে কেন বাংলাদেশর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন ব্যক্তি, এমনকি জেনারেল আজিজ আমার সাথে সংশ্লিষ্ট হলেন,” তিনি বলেন।

জেনারেল আজিজের সাথে পরিচয়
সামি খান ২০১৩ সাল থেকে হাঙ্গেরিতে বসবাস করছেন, এবং এ’সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রী বুদাপেস্টে এসেছেন এবং তার কাছ থেকে নানা রকম সহযোগিতা পেয়েছেন বলে তিনি জানান।

সামি খান বলছেন, জেনারেল আজিজের সাথে তার পরিচয় হয় ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে যখন তিনি বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশ বা বিজিবি’র মহাপরিচালক হিসেবে ইউরোপোলের একটি কনফারেন্সে যোগদানের জন্য হাঙ্গেরিতে আসেন।

”তখন আমার পরিচিত একজন আমাকে জানায় তিনি আসবেন, এবং অনুরোধ করে আমি যেন তার সাথে দেখা করি এবং বুদাপেস্ট দেখানোর জন্য সাহায্য করি,” মি. খান বলেন। জেনারেল আজিজকে একজন ”বিচক্ষণ ব্যক্তি” হিসেবে বর্ণনা করে মি. খান বলেন, ”অবশ্যই তিনি আমার ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর খোঁজখবর নিয়েই অগ্রসর হয়েছেন।”

”উনার সাথে যখন বিস্তারিত কথা হয়, উনি আমার বাবার ব্যাপারে জানতে পারেন, উনি আমার স্ত্রীর বাবার ব্যাপারে জানতে পারেন। উনি আমাকে এটাও বলেন যে উনি আমার বাবার সাথে এবং আমার শ্বশুরের সাথে একেবারেই ঘনিষ্ঠভাবে চাকরী করেছেন,” তিনি বলেন।

মি. খানের বাবা এবং শ্বশুর দু’জনই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে উচ্চপদস্থ অফিসার ছিলেন।
সামি খান বলেন যে জেনারেল আজিজ তাকে অনুরোধ করেন, তার ভাইকে হাঙ্গেরিতে ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে সহায়তা করার জন্য। কাজের উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ব্যবসা শুরু করতে গেলে যাদের প্রয়োজন হবে যেমন, আইনজীবী, এ্যাকাউনট্যান্ট তাদের জোগাড় করা ইত্যাদি।

মি. খান বলেন, ২০১৫ সালে জেনারেল আজিজের ভাই হাঙ্গেরিতে আসেন মোহাম্মদ হাসান পরিচয়ে। তখন কি তিনি জানতেন যে মি. হাসানের ভিন্ন একটি পরিচয় আছে? এই প্রশ্নের জবাবে মি. খান বলেন, না, তিনি তখন সেটা জানতেন না।

সম্পর্কের অবনতি যেভাবে শুরু
সম্পর্কের অবনতি শুরু হয় যখন তিনি ধারণা করলেন ব্যবসা করা হয়তো মি. হাসানের লক্ষ্য না। তার মতে, ব্যবসায়ীদের চাল-চলনে যে ভাব-ভঙ্গি থাকে, মি. হাসানের মধ্যে তিনি সেটা দেখতে পান নি।
বাংলাদেশে তার বন্ধুদের কাছে খোঁজ নিলে তারা মি. হাসানকে একজন ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন ইন্টারপোলের রেড লিস্টে তার নাম আছে।

”আমি নিজে রিসার্চ করে দেখতে পাই ওনার নামে আসলেই পুলিশের কাছে মামলা আছে। তখন আমি তাকে বলি, আমাকে যে মিথ্যা কথা তিনি বলেছেন সেটা তিনি ঠিক করেন নি। আমি আজিজ স্যারকেও বলি, আমি তো আপনার কলিগের ছেলে, কলিগের মেয়ের জামাই, আপনি জেনে শুনে কেন এই কাজটা করলেন।”

সামি খান বলেন, তিনি জেনারেল আজিজকে জানিয়ে দেন তার ভাইকে আর সাপোর্ট দেয়া তার পক্ষে সম্ভব হবে না। এই পর্যায়ে দু’জনের সম্পর্কে বড় ফাটল ধরে। মি. খান দাবী করেন যে এক পর্যায়ে জেনারেল আজিজ বলেন তিনি ‘তার জীবন তছনছ’ করে দিতে পারেন। ”তখন আমি মনে করলাম যে, এই লোকটাকে (মোহাম্মদ হাসান) আমার উপরে ভর করে আনা হয়েছিল। আমি যদি কাজগুলা না করতাম এই লোকটা এখানে আসতে পারত না।

”আমি তখন ভাবলাম, এটা আমার দায়িত্ব, আমাকেই এটার ফয়সালা করতে হবে। আমি ২০১৮ সালের শেষের দিকে আল জাজিরার সাথে যোগাযোগ করি, তাদের বলি আমার সাথে এরকম একটা ঘটনা ঘটেছে, আমি চাই আপনারা বিষয়টি তদন্ত করবেন।

”এর পরে আল জাজিরা নিজেদের মত করে আমার দেয়া তথ্যর সততা যাচাই করে, এবং এক-দু মাস পরে বলে আমার দেয়া তথ্য-প্রমাণ বেশ শক্তিশালী এবং তারা এটা নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হল,” তিনি বলেন। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে সামি খান ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে আল জাজিরার সাথে চুক্তিবদ্ধ হন।

মে ২০২০ সালে মামলা
সম্প্রতি আরেকটি সূত্র ধরে সামি খান বাংলাদেশে কর্তৃপক্ষের নজরে আসেন। প্রায় এক বছর আগে, ২০২০ সালের ৫ই মে ঢাকার রমনা থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ১১জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ”রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা” সহ কয়েকটি অভিযোগে মামলা করা হয়।

তাদের মধ্যে একজন ছিলেন জুলকারনাইন খান – যাকে আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ দফতর সামি খান হিসেবে শনাক্ত করেছে। (অভিযুক্তদের আরেকজন, লেখক মুশতাক আহমেদ ফেব্রুয়ারির ২৬ তারিখে কারাগারে বন্দী অবস্থায় আকস্মিকভাবে মারা যান)।

তিনি বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজনদের কাছে ‘সামি’ নামেই পরিচিত। তবে তার পুরো নাম সামি খান নয়। আল জাজিরার প্রতিবেদনে চেহারা দেখালেও, ইন্টারনেটে হয়রানির হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য তার পুরো নাম ব্যবহার করেন নি বলে মি. খান জানান।

রাষ্ট্রদোহ মামলা ফেরত
যেদিন ইন্টারনেট-ভিত্তিক একটি অ্যাপের মাধ্যমে তার সাথে কথা হচ্ছিল, সেদিন ঢাকার একটি আদালতে অন্য একটি মামলার শুনানি হচ্ছিল, যে মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। অভিযোগটা ছিল রাষ্ট্রদ্রোহ, যেটা সামি খানকে অবাক করেছিল। ”আমরা যারা এই ডকুমেন্টারিতে অংশগ্রহণ করেছি, আমরা কিন্তু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গিয়ে কোন কিছু বলার বলার চেষ্টা করি নি এবং বলি নি।

”বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি, এবং বাংলাদেশের জনগণ যাতে জানতে পারে যে কোন ধরনের দুষ্কৃতিকারী বা ষড়যন্ত্রকারীরা দেশের উন্নয়ন এবং সামনে এগিয়ে যাওয়াটায় রাশ টেনে ধরছে, আমরা তাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি।”

সাক্ষাৎকার শেষ হবার আগেই খবর আসে, ঢাকার আদালত মামলাটি গ্রহণ করেনি। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন এবং এই মামলায় কোন অনুমোদন ছিল না। ”তাহলে এটা প্রমাণ দিল আমাদের দেশে কোন না কোন ভাবে এখনো আইনের শাসন আছে, কিছু প্রতিষ্ঠানের ওপর আমরা এখনো ভরসা করতে পারি,” সামি খান বলেন।