মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে মানবিকতার দৃষ্টান্ত গড়েছেন শাহাদাৎ

বাংলাদেশ

করোনায় মৃতদের দাফনের ব্যবস্থা করে ও সাধারণ মানুষের কাছে ন্যায্যমূল্যে চাল বিক্রি করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ঝালকাঠির নলছিটি এলাকার তরুণ ব্যবসায়ী মো. শাহাদাৎ হোসেন ফকির। ১৯৮৭ সালে জন্ম নেয়া শাহাদাৎ বাবাকে হারিয়েছেন চার বছর বয়সে। ছোট থেকেই বড় ভাইয়ের সঙ্গে দোকানে কাজ করে পড়ালেখা চালিয়ে যান।

২০০২ সালে এসএসসি পাসের পর ভর্তি হন বরিশাল পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে। পরিবারে তার আরও দুই ভাই ছিলেন। একজন হঠাৎ কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুশয্যায় গেলে শাহাদাত আর পড়ালেখা করেননি। সেই ভাইয়ের মৃত্যুর পর আরেক ভাইয়ের দোকানে কাজ শুরু করেন শাহাদাত।

এভাবেই মা-বোনের খরচ চালাতেন তিনি। এক পর্যায়ে নলছিটি খাসমহল বাজার এলাকার রাস্তায় আলু ও পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করেন। বর্ষার পানিতে বহুবার আলু ও পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে ব্যাবসার ক্ষতি হয়েছে তার। বিবাহিত শাহাদাতের রয়েছে তিন সন্তান।

২০১৩ সালে থাইরয়েড ক্যানসার ধরা পড়লে হঠাৎ বিপদ নেমে আসে তার জীবনে। এ পর্যন্ত ভারতের চেন্নাইতে গিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন কয়েকবার। মৃত্যুকে তখনই কাছ থেকে দেখে মানবকল্যাণে নিজেকে নিয়জিত করেন তিনি। ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার তরুণ এই চাল ব্যবসায়ী গত আট বছর ধরে শরীরে ক্যানসার বহন করছেন।

দুই বছর আগে মারা যাওয়া তার মায়ের নামে একটি সেবামূলক ফাউন্ডেশন করেছেন। গত বছর রমজানে ব্যক্তি উদ্যোগে প্রায় ১০০ রেহাল বিতরণ করেছেন মানুষকে। এবারও প্রায় ১০০ রেহাল প্রস্তুত রেখেছেন। করোনা মহামারি থেকে মুক্তি পেতে নির্ধারিত ধর্মীয় দোয়া ও সতর্কবার্তা ছাপিয়ে হাজারো কপি বিতরণ করেছেন নিজেই।

শাহাদাৎ বলেন, মৃত্যুকে খুব কাছ থেকেই দেখেছি। তাই আমার চাহিদা সীমিত। টাকা আয় করে জমানোর প্রতি আগ্রহ কম। আল্লাহ রিজিকে যা রেখেছেন সেটুকুই আমি ভোগ করে যাব। রমজান মাস উপলক্ষে সাধারণ মানুষের জন্য প্রতি বস্তা চাল পাইকারি দামের চেয়েও অন্তত ৫০-৬০ টাকা কমে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ী শাহাদাৎ ফকির।

করোনা পরিস্থিতিতে মানুষের বিপদ দেখে দূরে থাকেননি। স্থানীয় মসজিদের ইমামসহ তিনজনের উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন ‘শাবাব ফাউন্ডেশন’। করোনায় মৃতদের গোসল করানোসহ দাফনের জন্য ফাউন্ডেশনের সদস্য আছেন ২৫ জন। এ পর্যন্ত মোট ১৭ জনের গোসল ও দাফন করিয়েছেন তারা।

ফাউন্ডেশন সম্পর্কে শাহাদাৎ বলেন, এখানে মুফতিসহ আলেমরা আছেন। তাদের ভূমিকায় আমরা পরিচালনা করি। এটি প্রতিষ্ঠায় মসজিদের ইমামসহ আমরা তিনজন উদ্যোগ ও সবকিছুর ব্যবস্থা করলেও কৃতিত্ব সবার। তিনি বলেন, মহামারির পরিস্থিতিতে মা সন্তানকে আবার সন্তান মাকে দাফন দিতে যায়নি।

সেই সময়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমরা এগিয়ে এসেছি। রমজান উপলক্ষে সাধারণ ক্রেতাদের কষ্টের কথা চিন্তা করে পাইকারি দামের চেয়েও প্রতি বস্তা ৫০ থেকে ৬০ টাকা কমে চাল বিক্রি করছি। যে দামে কেনা ঠিক একই দামে বিক্রি। একপয়সাও লাভ করছি না। পুরো রমজানজুড়ে এটি অব্যাহত থাকবে।

মো. শাহাদাৎ ফকিরের উদ্যোগ প্রশংসনীয় উল্লেখ করে নলছিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুম্পা সিকদার বলেন, পবিত্র রমজান মাস এবং করোনার সময় শাহাদাৎ ফকিরের এ উদ্যোগ মানুষকে অনেক স্বস্তি দেবে। যেখানে সবাই সবকিছুর দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন সেখানে তিনি কমিয়ে দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

শাহাদাতকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যায়ে (বিএসএমএমইউ) প্রায়ই চিকিৎসা ফলোআপে যেতে হয়। জীবনের বাকি সময় ভালো পথে থাকার জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চান। জীবনের গল্পগুলো বলতে গিয়ে বারবার কেঁদে ফেলেন তিনি। অনুরোধ করেন তিনি যে ভালো কাজগুলো করেছেন তা যেন প্রচার না হয়।