মুনিয়ার মৃত্যু: ৫০ লাখ টাকার রহস্য কী?

বাংলাদেশ

রাজধানীর গুলশানে একটি ফ্ল্যাট থেকে মোসারাত জাহান মুনিয়া নামের এক তরুণীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় বেরিয়ে আসছে নতুন সব তথ্য। ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে।

ভাইরাল অডিওক্লিপটিতে, এক ব্যক্তি এবং এক নারীর কথোপকথন শোনা যায়। সেই কথোপকথনে ৫০ লাখ টাকার কথা উঠে আসে। তবে এই টাকার উৎস নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠছে।

অডিও ক্লিপে ওই ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, আমার টাকাটা দিয়া দিস, তুইই আমার টাকা নিছস। কান্নারত তরুণী বলেন, আল্লাহরে ভয় পান না আপনি? আপনাকে কে বলছে আমি ৫০ লাখ টাকা নিছি, আমি কোনো টাকা নেই নাই।

উত্তরে অন্যপাশ থেকে ওই তরুণীকে বারংবার অকথ্য ভাষায় গালাগালি করা হয়। যদিও অডিওক্লিপটিতে কথা বলা দুইজনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে অডিওক্লিপটি ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকহারে ভাইরাল হয়েছে।

তবে অডিওক্লিপের তরুণীর পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া গেলেও ৫০ লাখ টাকার বিষয়টি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠছে। কার কাছ থেকে কী কারণে ৫০ লাখ টাকা নিয়েছেন সে বিষয়ে এখনো কিছুই জানা যায়নি।

আরও পড়ুন: লাখ টাকার ভাড়া ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন তরুণী
অন্যদিকে বাড়িওয়ালার কাছ থেকে পাওয়া চুক্তিপত্র অনুযায়ী ফ্ল্যাটটি মার্চ মাসের ১ তারিখে ভাড়া নেন মুনিয়া। পুলিশ জানায়, চুক্তিপত্র অনুযায়ী অগ্রিম ২ লাখ টাকা দিয়ে প্রতি মাসে ১ লাখ টাকা ভাড়ার বিনিময়ে ওই বাসায় একাই থাকতেন কলেজছাত্রী মুনিয়া।

আরও পড়ুন – মুনিয়ার মৃত্যু: অডিও ক্লিপ ভাইরাল

এদিকে পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী গণমাধ্যমকে, জানান দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে মোসারাত জাহানের পরিচয় ছিল। ওই ফ্ল্যাটে তার যাতায়াতের বিষয়েও তথ্য পাওয়া গেছে।

বড় বোনের অভিযোগ, ভিকটিমের সঙ্গে ওই শিল্প গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে পরিচয় এবং সম্পর্ক ছিল। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে মনমালিন্য ঘটে। পরবর্তীতে মুনিয়া কুমিল্লা চলে যান। পরে কুমিল্লা থেকে পুনরায় ঢাকায় আসেন। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীতে মুনিয়া তার বোনকে ফোন করে জানান, তার জীবনে যে কোনো সময় যে কোনো কিছু ঘটতে পারে।

সুদীপ আরও জানান, যদি সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় যে, অভিযুক্ত দোষী তাহলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতে যে ব্যবস্থা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ চলছে বলেও জানান তিনি।

রাষ্ট্র চিকিৎসকের চলাচল নির্বিঘ্ন করার নিশ্চয়তা দেবে

মুভমেন্ট পাস ও পরিচয়পত্র দেখতে চাওয়া নিয়ে গত রবিবার ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে বিএসএমএমইউ এর চিকিৎসক সৈয়দা শওকতের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়ায় পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেট। গতবছর ঠিক এইসময় করোনার প্রকোপ বেড়ে চলছিল। সারা পৃথিবীতে নেমে আসে বিপর্যয়।

ইতালিতে তখন দিনে ৪০০-৫০০ মানুষ মারা যাচ্ছে। মানুষ মারা যাচ্ছে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কিন্তু মৃত্যুর অন্তর্নিহিত কারণ কী, কেউ জানে না। চারদিকে আতংক আর মৃত্যু ভয়। লকডাউন দেওয়া হয়েছে সারা দেশজুড়ে। বিজ্ঞানীরা জানে না, গবেষকরা জানে না, ভাইরোলজিস্টরা জানে না করোনাভাইরাস সম্পর্কে।

নতুন এই ভাইরাস ও তার চিকিৎসা সম্পর্কে চিকিৎসকদেরও সম্যক ধারণা ছিল না। সবাই জানে মাস্ক পরতে হবে, সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখতে হবে, ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে হবে। এসব নিয়েও নানা মুনির নানা মত। কেউ বলে করোনা গ্রীষ্মের দাবদাহে মারা যাবে, কেউ বলে করোনা বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে চলে যাবে।

কেউ বলে চিকিৎসকদের পিপিই লাগবে না, কেউ বলে পিপিই ছাড়া চলবেই না। এসব অনিশ্চয়তার মধ্যেই তখন সবাই ঘুরপাক খাচ্ছে। খোদ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা একবার বলে শুধু করোনা রোগীরা মাস্ক পরলেই হবে, সাধারণ মানুষের মাস্ক পরার প্রয়োজনীয়তা নেই। সকালে বলে এক কথা, বিকালে বলে আরেক কথা।

সিডিসি একবার বলে শুধু ড্রপলেটের মাধ্যমে করোনা ছড়ায়, আবার একদিন পর বলে করোনা বাতাসে ছড়ায়। এভাবেই অনিশ্চয়তা ও অজানার মধ্যেই চলতে থাকে সবার অভিযাত্রা। করোনা ভাইরাস তো রোগী, ডাক্তার, ধনী, গরিব আলাদা করতে পারে না।

তাই রোগী থেকে চিকিৎসক যেমন আক্রান্ত হতে পারে ঠিক তেমনি চিকিৎসক থেকেও রোগীদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। তাই জরুরি চিকিৎসা সেবা ছাড়া সব প্রাইভেট চেম্বার ওই সময় বন্ধ করা হলো। তখন প্রশাসন কী করল? সব প্রাইভেট হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে কোন চিকিৎসক প্রাইভেট চেম্বার করছে না, কার চেম্বারে তালা ঝুলছে তা খুজে খুঁজে তার লিস্ট করলো।

যেসব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক চেম্বার করছে না তাদের রীতিমতো হেনস্তা করা শুরু করল। অনেক সাহসী, মানবিক চিকিৎসকরা তখন অজানা শত্রুর বিরুদ্ধে ঢাল তলোয়ার ছাড়াই যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন, ফলশ্রুতিতে কয়েক মাসের মধ্যে প্রায় একশ জন চিকিৎসককে হারালাম।

জাতি হারিয়েছে তার অমূল্য চিকিৎসকদের, আমরা হারিয়েছি আমাদের শিক্ষক আমাদের গুরুজনদের আর স্বজনরা হারিয়েছে তাদের প্রিয়জনদের। একটি অজানা শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আগে অবশ্যই তার গতিবিধি সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকতে হয়। শুধু পেশিশক্তি দিয়ে বা সৈনিকের সংখ্যা দিয়ে যুদ্ধে জয়লাভ করা যায় না।

যুদ্ধে জয়লাভের প্রধান অস্ত্র কৌশল। সেই কৌশল রপ্ত করার জন্য চিকিৎসকেরা কিছুদিন অপেক্ষা করছিলেন। তখন চিকিৎসকরা সরকারি হাসপাতালে এবং প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিচ্ছিলেন। অপ্রয়োজনে হাসপাতালে আসা বন্ধ করাই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য।

একজন চিকিৎসক বেঁচে থাকলে শত শত রোগীদের বাঁচাতে সক্ষম হবে। এটিই যুদ্ধকালীন সময়ে অমোঘ সত্য ও চরম কঠিন বাস্তবতা। দ্বিতীয় লকডাউন। এবার চিকিৎসকরা প্রস্তুত। প্রাইভেট চেম্বার করতে যাচ্ছে, নিজেদের ডিউটিতে যাচ্ছে। কিন্তু এবারের লকডাউন ব্যতিক্রম। চিকিৎসকরা প্রাইভেট চেম্বারে যাচ্ছে সেখানে তাদের গাড়ি আটকে দেওয়া হচ্ছে।

সরকারি চিকিৎসকরা তাদের কর্মস্থলে যাবে সেখানে মুভমেন্ট পাশের নামে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে ডাক্তাররা জনগণের সেবা করতে যায়, সরকারি কাজ করতে যায় সেখানে তাদের বাধা দেওয়া হচ্ছে।

তাহলে কি এইবারের করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসকদের সেবা ছাড়াই সুস্থ হয়ে যাবেন? প্রথম লকডাউনে চিকিৎসকদের বাসা থেকে ধরে নিয়ে প্রাইভেট চেম্বার করিয়েছেন, সংক্রমণের চেইন দীর্ঘ করেছেন আর এইবার লকডাউনে চিকিৎসকদের সরকারি হাসপাতালে ডিউটি করতে দিতে চাইছেন না।

কারণটা কী এখনো বোধগম্য নয়। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অ্যাপ্রনে দেশের সর্বোচ্চ মেডিকেল বিদ্যাপীঠের লোগো অংকিত আছে, তার গাড়িতে প্রতিষ্ঠানের লোগো আছে।

তিনি নিজে পরিচয় দিয়েছেন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তাকে আপনারা আইডি কার্ডের দোহাই দিয়ে আটকে রেখেছেন। একজন চিকিৎসক এই করোনা মহামারীতে তার নিজের জীবন, পরিবারের সবার জীবনবাজি রেখে করোনা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা করতে যান।

তার চলাচলে রাষ্ট্র কখনো বাধা দিতে পারে না, রাষ্ট্র তার চলাচল নির্বিঘ্ন করার নিশ্চয়তা দেবে। যুদ্ধাবস্থায় একজন চিকিৎসকের গতিরোধ করার নিয়ম নেই, আর আপনারা পরিচয় পাওয়ার পরেও আদিখ্যেতা আর পেশাগত দম্ভ দেখানোর জন্য তার গতিরোধ করেছেন।

একজন মুমূর্ষু রোগী যখন অক্সিজেনের অভাবে কাতরাতে থাকে তখন চিকিৎসক নিজের জীবনের মায়া ভুলে গিয়ে রোগীর মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে দেযন। যখন মরণাপন্ন রোগীকে ফেলে রোগীর স্বজনরা পালিয়ে যাযন, তখনও একজন চিকিৎসক সেই রোগীর পাশে থাকেন।

মহামারীর এই পরিস্থিতিতে ও জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে চিকিৎসকরা সবচেয়ে সম্মুখ সারীর যোদ্ধা। চিকিৎসক ছাড়া বাকি সব ক্যাডার কোভিড পরিস্থিতিতে প্রণোদনা পেয়েছেন, ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন, সুযোগ সুবিধা পেয়েছেন। চিকিৎসক কী পেয়েছে? কিছুই পায়নি।

একজন চিকিৎসক সেবা করেন দায়িত্ববোধ থেকে, মানবিকতা থেকে, দেশপ্রেম থেকে। কোনো কিছু পাওয়ার আশায় সে সেবার ব্রত নিয়ে এই পেশায় আসে না। এই পরিস্থিতিতে পুলিশের উচিত ডাক্তারদের গাড়ি দেখে তাদের স্যালুট দেওয়া। তাদের চলার পথ মসৃণ করা।

তাদের নিরাপদে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া। এই স্যালুট দেওয়া মানে পুলিশের ছোট হয়ে যাওয়া নয়, এই স্যালুট দেওয়া মানে চিকিৎসক বড় হয়ে যাওয়া নয়। এই স্যালুট দেওয়া মানে আপনি চিকিৎসকদের কাজে উৎসাহ দিচ্ছেন, পরোক্ষভাবে জনগণের সেবা করছেন।