ঈদের আগেই লকডাউন তুলে নেওয়ার দাবি শাহজান খানের

বাংলাদেশ

গণপরিবহন চালু করে ঈদের আগেই লকডাউন তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পরিবহন শ্রমিক নেতা শাজাহান খান। বলছেন, কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মানবেন চালক ও শ্রমিকরা। এদিকে আশ্বস্ত করে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলছেন, এ দফায় লকডাউনের পর গণপরিবহন চলতে পারে।

বছরের ব্যবধানে সারাদেশে আবারও লকডাউন। করোনা সংক্রমণ রোধে গত মাসের ৫ তারিখ থেকে দূর পাল্লায় গণপরিবহন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। মাঝে কয়েকদিন রাজধানীর ভেতরে গণপরিবহন চললেও এখন বন্ধ সবই। যদিও এরই মধ্যে লকডাউন কিছুটা শিথিল করে খুলে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন অফিস, শপিংমল।

এ প্রেক্ষাপটে গণপরিবহন চলাচলের জোর দাবি জানিয়ে আসছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। ঈদের আগেই লকডাউন বাতিল চেয়ে সড়ক পরিবহন নেতা এবং ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য শাহজান খান বলছেন, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে এবার কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মানাতে বাধ্য করা হবে সবাইকে।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে গণপরিবহন চলাচল করবে। এ নিশ্চয়তা দিতে চাই, স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে আমরাও খুব কঠোর ব্যবস্থা নেব। আমরা কিন্তু লকডাউনের বিরোধিতা করছি না। লকডাউন যদি করতে হয় করার মতো করতে হবে। আর যদি শিথিল করতে হয় তাহলে সবার জন্য শিথিল করতে হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোশতাক হোসেন বলেন, গণপরিবহন চালুর আগে সরকারকে ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে হবে। না হলে আবারও বাড়তে পারে সংক্রমণ। এদিকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলছেন, ঈদের আগে পরিবহন চালুর কথা ভাবছে সরকার।

তবে সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান তিনি। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, সরকার ঈদ এবং রমজানের কথা বিবেচনা করে এবং যারা দোকানপাট, শপিংমলে কাজ করে তাদের কথা চিন্তা করে লকডাউন শিথিল করেছে।

লকডাউনের পর ঈদকে সামনে রেখে জনস্বার্থে গণপরিবহন চালুর ব্যাপারেও চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে।করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি রোধে চলমান কঠোর বিধিনিষেধ আগামী ৫ মে পর্যন্ত বাড়িয়েছে সরকার।

সব বন্ধ, পেট তো বন্ধ নেই, কামড় দেয় ক্ষুধাসব বন্ধ, পেট তো বন্ধ নেই, কামড় দেয় ক্ষুধা

রাজধানীর তোপখানা রোডের যে পাশে জাতীয় প্রেসক্লাব, ঠিক তার উল্টো দিকেই মুদ্রাক্ষরিকদের (টাইপরাইটার) ছোট ছোট দোকান। একই সঙ্গে আইনজীবীদের সহকারী হিসেবে নোটারি পাবলিক করিয়ে দেওয়ার কাজও করেন তাঁরা। বিনিময়ে আইনজীবীরা কিছু পান, বাকিটা নেন এসব সহকারী।

তবে দোকান মানে একটা কাঠের চেয়ার, একটা টেবিল আর একটা টুল। গতকাল মঙ্গলবার খাঁ খাঁ দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কাঠের চেয়ার-টেবিলগুলো ওলটানো। শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা এগুলো। মুদ্রণজগতে কম্পিউটারের প্রচলন শুরু হওয়ার পর থেকে এমনিতেই মুদ্রাক্ষরিকদের কাজ ও কদর কমে আসছে।

করোনাভাইরাস আসার পর তা এখন একেবারেই বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। ১৪ এপ্রিল দেশব্যাপী সর্বাত্মক লকডাউন শুরুর পর থেকে মুদ্রাক্ষরিকেরা সবাই ঘরবন্দী। কথা বলার একজন লোকও পাওয়া যায়নি গতকাল। সেখানে পাওয়া যায় মো. আকরামুল ইসলাম নামের একজনের, যাঁর একটি দোকান রয়েছে।

ওই দোকানে তিনি ফটোকপি ও মোবাইলে টাকা রিচার্জের পাশাপাশি মোবাইলে আর্থিক সেবা দাতা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট হিসেবেও কাজ করেন। বিকাশ, নগদ, রকেটের দোকান খুলতে যেহেতু বাধা নেই, তাই তিনি খুলেছেন। কিন্তু গ্রাহক নেই। তিনি জানান, ১৯৭৩ সালে ৬৫ জন মুদ্রাক্ষরিক এখানে বসা শুরু করেন। এখন আছেন ৩৪ জন।

তোপখানা রোড পেশাজীবী মুদ্রাক্ষরিক কল্যাণ সমিতির সদস্য তাঁরা। কাজ না থাকায় লোকগুলো খুবই কষ্টে আছেন। আকরামুল ইসলাম জানান, কাজ নেই, গ্রাহকও নেই। তবু কাজের আশায় গতকাল ঢাকার মানিকনগর থেকে পায়ে হেঁটে তোপখানা রোডে এসেছিলেন টাইপরাইটার নূরনবী হোসেন। কিন্তু সেই আশার গুড়ে বালি।

কিছুক্ষণ বসে থেকে আবার হেঁটে হেঁটে চলে যান তিনি। কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাই বলায় আকরামুল পুরোনো মুদ্রাক্ষরিক আলী আহমেদের মোবাইল নম্বর দেন। বিকেলে ফোন করে পরিচয় দিতেই আলী আহমেদ বলেন, ‘৩০ বছর ধরে তোপখানা রোডে আসছি। এমন খারাপ সময় কখনো আসেনি, যদিও অনেক আগে থেকেই আমাদের দিন খারাপ হয়ে আছে।

টাইপ করতে কেউ আসেন না। সব খেয়ে ফেলেছে কম্পিউটার। তবে মাঝে মাঝে নোটারি করতে লোক আসেন। আইনজীবীদের মাধ্যমে তা করাতে হয়। গ্রাহকদের কাছ থেকে যা পাওয়া যায়, তা থেকে আইনজীবীরা আমাদের একটা অংশ দেন। তাতে কোনো দিন ২০০ টাকা, কোনো দিন ৩০০ টাকা পাই।

ভাগ্য ভালো থাকলে ৫০০ টাকাও পাওয়া যায় কোনো কোনো দিন। এই আয় থেকে চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসার একটা ভাড়াও দিতে হয় সিটি করপোরেশনকে।’ কিন্তু এখন তো সবই বন্ধ। ফলে দোকান ভাড়াই কী দেবেন, আবার বাড়ি ভাড়াই কী দেবেন—তা নিয়ে চিন্তিত আলী আহমেদ। তিন বেলা খাওয়ার ব্যবস্থা কীভাবে করবেন—সেই চিন্তায় দিশেহারা তিনি।

বলেন, ‘জীবনে আর কিছু শিখিনি। বয়স হয়েছে, শেখার সুযোগও নেই আর। কিন্তু পেটটা তো আছে। পেট তো বন্ধ নেই, কামড় দেয় ক্ষুধা।’ আলী আহমেদের পাঁচ ছেলেমেয়ের মধ্যে দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। এক মেয়ে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছেন। ১০ বছর বয়সী একটা প্রতিবন্ধী ছেলে আছে। তিনি বলেন, ‘শুনেছি, প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের ভাতা দেয় সরকার। আমার ছেলেটা পায় না।’