দরিদ্র মাদ্রাসা ছাত্রী খাদিজা এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক !

বাংলাদেশ

ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক মাদ্রাসা ছাত্রী খাদিজা খাতুন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ায় তার এলাকায় আনন্দের বন্যা বইছে।

হত দরিদ্র ঘরের সন্তান হয়েও এত বড় অর্জন করায় খুশি এলাকাবাসী।ফুলবাড়ীয়া উপজে’লা সদর হতে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রায় ৩০কিলোমিটার অদূরে এনায়েতপুর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের এনায়েতপুর গ্রামের মহিষেরচালা (মইষের) এ খাদিজা এর বাড়ি।

এনায়েতপুর বাজার ভায়া রাজঘাট কাঁচা রাস্তা ঘেঁষে খাদিজার বাড়ী। সাধারণ একটি নিরীহ বাড়ীর মতই এটি। বাড়ীতে টিনসেট ৩টি ঘর। খাদিজা খাতুনের বাবা মো: রুহুল আমিন, মাতা হালিমা খাতুন, তাঁর ৪ ছেলে, ২ মেয়েসহ ৮ জনের সংসার। ভাই-বোনদের মধ্যে খাদিজা দ্বিতীয়।

বড় ছেলে সোহাগ কৃষক, তৃতীয় সন্তান তাসলিমা- ইডেন কলেজের ছাত্রী, চতুর্থ সন্তান আনোয়ার হোসেন মুঞ্জু- এম এম আলী কলেজের অনার্সের ছাত্র, পঞ্চম সন্তান আজহারুল ইসলাম (শা’রীরিক প্র’তিবন্ধি)- চলতি দাখিল পরীক্ষার্থী, তারিকুল ইসলাম- পঞ্চম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত। খাদিজা খাতুনের নানার বাড়ী রাজঘাট এলাকায়।

বাড়ীর কাছে এনায়েতপুর ফাজিল (ডিগ্রী) মা’দ্রাসা (রাজঘাট মা’দ্রাসা)। ঐ সময় সেই মা’দ্রাসায় ৪র্থ শ্রেণিতে লেখাপড়া করতো খাদিজার মামা মোশাররফ। সেই সুবাধে খাদিজার লেখাপড়া শুরু মা’দ্রাসা থেকে। ৮বছর লেখাপড়া শেষে ৮ম শ্রেণীতে উদ্দীপনা পুরস্কার পেয়ে পরীক্ষায় উপজে’লায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে।

মেধাবী ছাত্রীর অভিভাবক হিসেবে পরিচালনা কমিটিতে স্থান হয় খাদিজার বাবা মো: রুহুল আমিনের। দাখিল পরীক্ষায় গো’ল্ডেন ‘এ’ প্লাস অর্জন করেন খাদিজা। ঐ মা’দ্রাসায় আলিমে বিজ্ঞান শাখা না থাকায় তাঁর মেয়েকে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম কলেজ ময়মনসিংহে ভর্তি করানোর জন্য চেষ্টা করেন।

যেদিন নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে যান খাদিজা সে দিন পরীক্ষার হলে প্রবেশের পূর্বে বাবা-মায়ের দোয়া (আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁ’দে ফে’লেন বাবা নিয়েছিলেন। সোনার হরিণ প্রাচ্যের অক্সফোর্ট খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক পদে ২ফেব্রুয়ারি/২০১৭ ফলিত গণিত বিভাগে যোগদান করেন খাদিজা। চোখের পানি মুছতে মুছতে বাবা রুহুল আমিন বলেন আমার আশা পূরণ হয়েছে।

প্রথমে আল্লাহর কাছে শু’করিয়া আদায় করে বাবা রুহুল আমিন শিক্ষক, এলাকাবাসীসহ সকলের কাছে কৃ’তজ্ঞতা জানিয়েছেন। নাম দস্ত’খত জানা রুহুল আমিন জানিয়েছেন, তিনি নিয়ত করেছিলেন যদি মেয়ের একটু হেল্প পান তাহলে বাকী সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে কোন সময় পিছপা হবেন না তিনি।

অবশেষে তার আশা পূরণ হওয়ায় তিনি মহাখুশি। মাতা হালিমা খাতুন জানান, বাড়ীতে আত্নীয় স্বজনের আনা-গোনা বেড়ে গেছে। বাড়ীতে অনেকে এসে বলে কে খাদিজার মা? আমি খাদিজার মা হতে পেরে নিজেকে গ’র্ববোধ মনে করছি। আপনারা আমার কলিজার টুকরা খাদিজার জন্য দোয়া করবেন।

এনায়েতপুর ফাজিল (ডিগ্রী) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এ.কে.এম হাবিবুল্লাহ ফকির জানিয়েছেন, ৮ম শ্রেণীতে বৃত্তি পেয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল খাদিজা। নিয়মিত কাসের পাশাপাশি ৯ম-১০ম শ্রেণীতে আবাসিক ফ্রি কা’শ করাতেন শিক্ষকরা। শাহাবুদ্দিন ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ মো: মকবুল হোসেন জানিয়েছেন,

খাদিজা আমাদের কলেজে ভর্তি হবার পর থেকে তাঁর লেখাপড়ার আগ্রহে আমরা মুন্ধ ছিলাম। আমার ধারণা ছিল সে একদিন বাংলাদেশের বিশিষ্টজনদের একজন হবে। সেটি সত্যি হয়েছে, আমরা গ’র্ববোধ করি। তার কমর্ময় জীবন আরও সুখময় হউক।

খাদিজা খাতুন বলেন, অজোপাড়া গায়ের সন্তান আমি। অ’বহেলিত ও অশিক্ষিত সেই সমাজের মানুষের জন্য কাজ করতে চাই এবং মানুষের পার্শ্বে দাঁড়াতে চাই। প্র’ত্যাশিত আশা পূরণ হয়েছে তবে আমি অনেক দূর অগ্রসর হতে চাই।

অদম্য নারী হাফেজদের গল্পঅদম্য নারী হাফেজদের গল্প

‘প্রথম হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় জাতীয় পুরস্কার পাই সেই শৈশবে, ১০ বছর বয়সে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে; আরেকটি ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে। সেটি ১৯৮৬ সালের কথা। তারপর ১৯৯০ সালে যেতে চাই আন্তর্জাতিক কেরাত প্রতিযোগিতায়। কিন্তু বয়স স্বল্পতার কারণে তার অনুমতি মেলেনি।’
ছবি: লেখক

‘প্রথম হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় জাতীয় পুরস্কার পাই সেই শৈশবে, ১০ বছর বয়সে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে; আরেকটি ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে। সেটি ১৯৮৬ সালের কথা। তারপর ১৯৯০ সালে যেতে চাই আন্তর্জাতিক কেরাত প্রতিযোগিতায়। কিন্তু বয়স স্বল্পতার কারণে তার অনুমতি মেলেনি।’

কথাগুলো বলছিলেন হাফেজা কারিয়া শামসুন্নাহার সিদ্দিকা। অনুমতি পাননি বলে থেমে যাননি। তার বাবা মাওলানা শরাফত উল্লাহ খুব করে চাইতেন, মেয়ে তার আন্তর্জাতিক কেরাত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করুক।বিয়ের পর তাকে আরেকটু এগিয়ে দিলেন তার স্বামী ডাক্তার মুহাম্মদ আমিরুল ইসলাম।

প্রিয়তম স্বামীর উৎসাহে শামসুন্নাহারের স্বপ্নের ঘোড়া তখন আরও তেজস্বী হয়ে ওঠে। দেশের সীমানা পেরিয়ে তিনি তখন ডানা মেলেন বিদেশের মাটিতে। মালয়েশিয়ায় আন্তর্জাতিক কেরাত প্রতিযোগিতায় ৭ বার তিনি চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। ২০০৪ সাল থেকে টানা ২০০৯ সাল পর্যন্ত। সর্বশেষ ২০১৬ সালে।

এর আগে ১৯৯৮ সালে হয়েছিলেন দ্বিতীয়। ইরানেও গিয়েছেন একবার। শামসুন্নাহারের চার মেয়ে। জানতে চাইলাম, সন্তান সামলে কীভাবে এসব প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছেন? তিনি বললেন, ‘আমার বাবার স্বপ্ন ছিল আমি আন্তর্জাতিক কেরাত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করব।

বিয়ের পর কেউ স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াননি। আমার শাশুড়ি, আমার বোন অনেক সময় আমার সন্তান সামলিয়েছেন। তবে যারা প্রতিযোগী থাকত বাংলাদেশের, তারা আমাকে আটকানোর চেষ্টা করেছে বহুবার! প্রতি বছরই যখন মালয়েশিয়া যাচ্ছি, কর্তৃপক্ষের মনে খটকা লাগল।

তখন বিশ-ত্রিশজন বিচারক একসঙ্গে বসে আমার পরীক্ষা নিলেন। তাদের মধ্যে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের মরহুম খতিব উবায়দুল হকও ছিলেন। আমার তিলাওয়াত শুনে তারা বললেন, ‘আসলেই তুমি যোগ্য।’ শামসুন্নাহারের চার মেয়ে। মেয়েদের সবাইকে তিনি নিজেই হাফেজা বানিয়েছেন।

তারা হলেন- হাফেজা ফাতিমাতুজ জুহরা মারিয়া, হাফেজা কারিয়া খাদিজাতুল কুবরা উলফাত, হাফেজা কারিয়া আয়েশা সিদ্দিকা, হাফেজা ফাবিহা বুশরা আরাবিয়া। বিশ্বজয়ী হাফেজা শামসুন্নাহার বলেন, ‘শেরপুর থেকে ঢাকায় এসে তেজগাঁও রহমতে আলম মিশন মাদ্রাসায় পড়াশোনা করি।

মূলত এখানে হেফজ শুনাই। পাশাপাশি অন্যদের মশকও করাতাম। বিয়ের পর কিছুদিন এখানে শিক্ষকতা করেছি। তারপর চলে এসে নিজে একটি মাদ্রাসা দিই। মাদ্রাসার বয়স ২৭ বছর। আমার চার মেয়ে আমার কাছেই হাফেজ হয়েছে।’ মা যেমন বিশ্বজয়ী হাফেজা, তেমনি ঠিক তার মেয়েরাও।

মেয়েরা তার কাছে হাফেজ হয়ে তাজবিদ ও লেহান (স্বর ও সুর) শেখার জন্য পড়াশোনা করছেন মারকাযুত তাহফিজ ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায়। তিনি বললেন, ‘সাধারণত মহিলা মাদ্রাসায় তাজবিদের প্রতি তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কিন্তু হাফেজ নেসার সাহেবের মাদ্রাসায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তাই মেয়েদের সেখানে পাঠিয়েছি। আমার মেয়ে আয়েশা পাঁচ বছর বয়সে ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে জাতীয় পুরস্কার পায়। আমার বাবা আমাকে বলেন, ‘তুমি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছ ১০ বছর বয়সে, আর তোমার মেয়ে পেয়েছে পাঁচ বছর বয়সে।’ হাফেজা আয়েশা সিদ্দিকা ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় যেতে চেয়েছিল।

বয়স স্বল্পতার অজুহাতে অনুমতি মেলেনি। ২০১৮ সালে বয়স পার হলেও পাসপোর্ট জটিলতায় তার ইরান যাওয়া অনেকটাই আটকে যায়। অবশ্য বহু কাঠখড় পড়ানোর পর যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল তার। ইরান থেকে নিয়ে এসেছিলেন চ্যাম্পিয়ন পুরস্কার। সর্বশেষ ২০১৯ সালে দুবাই আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় যাওয়ার জন্য নির্বাচিত হন।

কিন্তু করোনার প্রকোপে আর যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তার বড় বোন খাদিজাতুল কুবরা ২০২০ সালে ইরান আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতার জন্য নির্বাচিত হয়েছিল। করোনার প্রকোপে তাও থমকে গেছে। খাদিজাতুল কুবরা বলেন, ‘কুরআন তিলাওয়াত আমার নেশা হয়ে গেছে। দৈনিক পাঁচ পারা কাউকে না শুনালে আমার ভালোই লাগে না।’

আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, ‘রমজানে এখন নামাজে বেশি তিলাওয়াত করি। প্রতিদিন জোহর নামাজে যে দুই পারা তিলাওয়াত করি, সেই দুই পারা আসর, মাগরিব, এশা ও তাহাজ্জুদেও তেলাওয়াত করি। ফলে একদিনে এই দুই পারা পাঁচবার তিলাওয়াত হয়। পুরো রমজানে নামাজেই হবে ১০ খতম।’ এমন গুণী মেয়েদের পেয়ে গর্বিত কিনা জানতে চাইলে হাফেজা শামসুন্নাহার বলেন, ‘হাফেজদের মায়েদের জন্য আখেরাতে রয়েছে জান্নাত।

কিন্তু আমার মেয়েদের দিকে তাকালে, তাদের তিলাওয়াত শুনলে মনে হয়, আল্লাহ আমাকে পৃথিবীতেই জান্নাত দিয়ে দিয়েছেন। আমি চাই, তারা হিফজ অটুট রাখুক। দ্বীনের পথে চলুক। কুরআনের আলো ছড়িয়ে দিক দিগ্বিদিক। যেন আখেরাতে কোথাও আটকাতে না হয়।’
লেখক : তরুণ আলেম, সমাজকর্মী ও ধর্মীয় নিবন্ধকার