এক সময় চা বেচতেন রিকশাচালককে নির্যাতনকারী সেই প্রভাবশালী

বাংলাদেশ

বংশালে রিকশাচালককে নির্যাতনকারী সেই প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এক সময় গরিব ছিলেন। তিনি বংশালেই এক সময় চা বিক্রি করতেন বলে জানা গেছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার আর্থিক উন্নতি ঘটে কপাল খুলে নিজের আগের অবস্থানের কথা বেমালুম ভুলে গেলেন। খেটে খাওয়া শ্রমিককেই প্রকাশ্যে নির্যাতন করলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মঙ্গল ভাইরাল হয়েছে রিকশাচালককে এক ব্যক্তির মারধরের ভিডিও। যেখানে দেখা গেছে, জ্যাম বাঁধানোর অভিযোগে একের পর এক চড়-থাপ্পড় মারতে মারাতে রিকশাচালককে অজ্ঞান করে ফেলেন ওই ব্যক্তি। মঙ্গলবার কে বা কারা ফেসবুকে ভিডিওটি আপলোড করার পর থেকে সারাদিন এ নিয়েই বেশি চর্চা হয়।

অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান। অনেকেই এমন দাম্ভিক ও প্রভাব খাটানো পাষাণ হৃদয়ের ব্যক্তির পরিচয় জানতে উৎসুক হন। ঘটনার দিনই সন্ধ্যায় ওই ব্যক্তিকে আটক করে তার পরিচয়ও প্রকাশ করেছে পুলিশ।

জানা গেছে, রাজধানীর বংশালে ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অফিসের সামনে মঙ্গলবার ঘটনাটি ঘটে। এ বিষয়ে বংশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহীন ফকির গণমাধ্যমকে জানান, রিকশাচালককে নির্যাতন করে আটক ওই ব্যক্তির নাম মো. সুলতান আহমেদ।

তিনি পেশায় বাচ্চাদের বাইসাইকেলের ব্যবসায়ী। রাজনৈতিক কোনো পরিচয় না থাকলেও বংশাল এলাকায় তার প্রভাব আছে। ওসি আরও জানান, ‘মো. সুলতান আহমেদের বাবার নাম আব্দুস সামাদ। বংশাল এলাকায় তাদের একটি চারতলা বাড়ি রয়েছে; এটির হোল্ডিং নম্বর ৩১/২। সেখানে তারা পাঁচ ভাই থাকেন।

বংশালের স্থানীয় বাসিন্দা এবং সাইকেলের (বাচ্চাদের) একটি দোকান রয়েছে তার। সাইকেলের দোকান নেওয়ার আগে দীর্ঘ কয়েকবছর বংশালের পায়রা চত্বর এলাকায় ‘সুলতান টি’ নামে একটি দোকানে চা বিক্রি করতেন তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা হওয়ায় নিজের প্রভাব খাটিয়ে সুলতান বিনা কারণে ওই রিকশাচালককে মারধর করেছেন।’ ভুক্তোভোগী রিকশাচালক মামলা বা অভিযোগ করলে আইনি পদক্ষেপ নেবেন বলে জানান ওসি মো. শাহীন ফকির।

সব বন্ধ, পেট তো বন্ধ নেই, কামড় দেয় ক্ষুধাসব বন্ধ, পেট তো বন্ধ নেই, কামড় দেয় ক্ষুধা

রাজধানীর তোপখানা রোডের যে পাশে জাতীয় প্রেসক্লাব, ঠিক তার উল্টো দিকেই মুদ্রাক্ষরিকদের (টাইপরাইটার) ছোট ছোট দোকান। একই সঙ্গে আইনজীবীদের সহকারী হিসেবে নোটারি পাবলিক করিয়ে দেওয়ার কাজও করেন তাঁরা। বিনিময়ে আইনজীবীরা কিছু পান, বাকিটা নেন এসব সহকারী।

তবে দোকান মানে একটা কাঠের চেয়ার, একটা টেবিল আর একটা টুল। গতকাল মঙ্গলবার খাঁ খাঁ দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কাঠের চেয়ার-টেবিলগুলো ওলটানো। শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা এগুলো। মুদ্রণজগতে কম্পিউটারের প্রচলন শুরু হওয়ার পর থেকে এমনিতেই মুদ্রাক্ষরিকদের কাজ ও কদর কমে আসছে।

করোনাভাইরাস আসার পর তা এখন একেবারেই বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। ১৪ এপ্রিল দেশব্যাপী সর্বাত্মক লকডাউন শুরুর পর থেকে মুদ্রাক্ষরিকেরা সবাই ঘরবন্দী। কথা বলার একজন লোকও পাওয়া যায়নি গতকাল। সেখানে পাওয়া যায় মো. আকরামুল ইসলাম নামের একজনের, যাঁর একটি দোকান রয়েছে।

ওই দোকানে তিনি ফটোকপি ও মোবাইলে টাকা রিচার্জের পাশাপাশি মোবাইলে আর্থিক সেবা দাতা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট হিসেবেও কাজ করেন। বিকাশ, নগদ, রকেটের দোকান খুলতে যেহেতু বাধা নেই, তাই তিনি খুলেছেন। কিন্তু গ্রাহক নেই। তিনি জানান, ১৯৭৩ সালে ৬৫ জন মুদ্রাক্ষরিক এখানে বসা শুরু করেন। এখন আছেন ৩৪ জন।

তোপখানা রোড পেশাজীবী মুদ্রাক্ষরিক কল্যাণ সমিতির সদস্য তাঁরা। কাজ না থাকায় লোকগুলো খুবই কষ্টে আছেন। আকরামুল ইসলাম জানান, কাজ নেই, গ্রাহকও নেই। তবু কাজের আশায় গতকাল ঢাকার মানিকনগর থেকে পায়ে হেঁটে তোপখানা রোডে এসেছিলেন টাইপরাইটার নূরনবী হোসেন। কিন্তু সেই আশার গুড়ে বালি।

কিছুক্ষণ বসে থেকে আবার হেঁটে হেঁটে চলে যান তিনি। কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাই বলায় আকরামুল পুরোনো মুদ্রাক্ষরিক আলী আহমেদের মোবাইল নম্বর দেন। বিকেলে ফোন করে পরিচয় দিতেই আলী আহমেদ বলেন, ‘৩০ বছর ধরে তোপখানা রোডে আসছি। এমন খারাপ সময় কখনো আসেনি, যদিও অনেক আগে থেকেই আমাদের দিন খারাপ হয়ে আছে।

টাইপ করতে কেউ আসেন না। সব খেয়ে ফেলেছে কম্পিউটার। তবে মাঝে মাঝে নোটারি করতে লোক আসেন। আইনজীবীদের মাধ্যমে তা করাতে হয়। গ্রাহকদের কাছ থেকে যা পাওয়া যায়, তা থেকে আইনজীবীরা আমাদের একটা অংশ দেন। তাতে কোনো দিন ২০০ টাকা, কোনো দিন ৩০০ টাকা পাই।

ভাগ্য ভালো থাকলে ৫০০ টাকাও পাওয়া যায় কোনো কোনো দিন। এই আয় থেকে চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসার একটা ভাড়াও দিতে হয় সিটি করপোরেশনকে।’ কিন্তু এখন তো সবই বন্ধ। ফলে দোকান ভাড়াই কী দেবেন, আবার বাড়ি ভাড়াই কী দেবেন—তা নিয়ে চিন্তিত আলী আহমেদ। তিন বেলা খাওয়ার ব্যবস্থা কীভাবে করবেন—সেই চিন্তায় দিশেহারা তিনি।

বলেন, ‘জীবনে আর কিছু শিখিনি। বয়স হয়েছে, শেখার সুযোগও নেই আর। কিন্তু পেটটা তো আছে। পেট তো বন্ধ নেই, কামড় দেয় ক্ষুধা।’ আলী আহমেদের পাঁচ ছেলেমেয়ের মধ্যে দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। এক মেয়ে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছেন। ১০ বছর বয়সী একটা প্রতিবন্ধী ছেলে আছে। তিনি বলেন, ‘শুনেছি, প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের ভাতা দেয় সরকার। আমার ছেলেটা পায় না।’