মালবাহী ট্রেনে যাচ্ছে যাত্রী

বাংলাদেশ

সারা দেশে ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ থাকলেও জরুরি মালামাল পরিবহনে রেলওয়ের বিভিন্ন রুটে কিছু পার্সেল ট্রেন চালু রয়েছে। মালামাল ছাড়া এসব ট্রেনে যাত্রী বহন নিষিদ্ধ থাকলেও বর্তমানে সব পার্সেল ট্রেনে অবাধে যাত্রী বহন করছে রেলওয়ের কিছু অসাধু কর্মচারী।

এ ছাড়া একই সঙ্গে ট্রেনে দায়িত্বরত রেল নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সহায়তায় চলছে মাদক পরিবহন। সম্প্রতি র‍্যাব একটি পার্সেল ট্রেন থেকে ২৮২ বোতল ভারতীয় ফেনসিডিল উদ্ধার এবং নিরাপত্তা বাহিনী ও রেলওয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের দুই সদস্যসহ চারজনকে আটক করে।

বুধবার বগুড়ার আদমদীঘির সান্তাহার জংশন স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, চিলাহাটি থেকে খুলনাগামী পার্সেল ট্রেনের একমাত্র যাত্রীবাহী কামরায় ঠাসাঠাসি করে বসে রয়েছেন শতাধিক যাত্রী। আবার ট্রেনটি স্টেশনে থামার পর ট্রেন থেকে নেমে যায় প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন যাত্রী। বেশির ভাগ যাত্রীর মুখে নেই কোনো মাস্ক।

ছবি তুলতে গেলে অনেকে কাপড়ে মুখ ঢেকে ফেলেন।নাম প্রকাশ না করার শর্তে ট্রেনের পরিচালক (গার্ড) বলেন, কামরায় যেসব যাত্রী রয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশ রেলওয়ে কর্মচারী বা স্বজন। এ কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। সব পার্সেল ট্রেনেই একই অবস্থা।

সান্তাহার স্টেশন মাস্টার হাবিবুর রহমান বলেন, ‘যাত্রীদের পার্সেল ট্রেনে না ওঠার জন্য জন্য আমরা নিষেধ করছি। কিন্তু বেশির ভাগ যাত্রী রেলসংশ্লিষ্ট হওয়ায় কিছু করা যাচ্ছে না।’ মাদক পরিবহনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়টি তদারকির জন্য ট্রেনে নিরাপত্তা বাহিনী থাকে। এখন তাঁরা যদি সঠিক দায়িত্ব পালন না করেন, তাহলে আমাদের করার কিছুই থাকে না।’

সব বন্ধ, পেট তো বন্ধ নেই, কামড় দেয় ক্ষুধাসব বন্ধ, পেট তো বন্ধ নেই, কামড় দেয় ক্ষুধা

রাজধানীর তোপখানা রোডের যে পাশে জাতীয় প্রেসক্লাব, ঠিক তার উল্টো দিকেই মুদ্রাক্ষরিকদের (টাইপরাইটার) ছোট ছোট দোকান। একই সঙ্গে আইনজীবীদের সহকারী হিসেবে নোটারি পাবলিক করিয়ে দেওয়ার কাজও করেন তাঁরা। বিনিময়ে আইনজীবীরা কিছু পান, বাকিটা নেন এসব সহকারী।

তবে দোকান মানে একটা কাঠের চেয়ার, একটা টেবিল আর একটা টুল। গতকাল মঙ্গলবার খাঁ খাঁ দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কাঠের চেয়ার-টেবিলগুলো ওলটানো। শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা এগুলো। মুদ্রণজগতে কম্পিউটারের প্রচলন শুরু হওয়ার পর থেকে এমনিতেই মুদ্রাক্ষরিকদের কাজ ও কদর কমে আসছে।

করোনাভাইরাস আসার পর তা এখন একেবারেই বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। ১৪ এপ্রিল দেশব্যাপী সর্বাত্মক লকডাউন শুরুর পর থেকে মুদ্রাক্ষরিকেরা সবাই ঘরবন্দী। কথা বলার একজন লোকও পাওয়া যায়নি গতকাল। সেখানে পাওয়া যায় মো. আকরামুল ইসলাম নামের একজনের, যাঁর একটি দোকান রয়েছে।

ওই দোকানে তিনি ফটোকপি ও মোবাইলে টাকা রিচার্জের পাশাপাশি মোবাইলে আর্থিক সেবা দাতা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট হিসেবেও কাজ করেন। বিকাশ, নগদ, রকেটের দোকান খুলতে যেহেতু বাধা নেই, তাই তিনি খুলেছেন। কিন্তু গ্রাহক নেই। তিনি জানান, ১৯৭৩ সালে ৬৫ জন মুদ্রাক্ষরিক এখানে বসা শুরু করেন। এখন আছেন ৩৪ জন।

তোপখানা রোড পেশাজীবী মুদ্রাক্ষরিক কল্যাণ সমিতির সদস্য তাঁরা। কাজ না থাকায় লোকগুলো খুবই কষ্টে আছেন। আকরামুল ইসলাম জানান, কাজ নেই, গ্রাহকও নেই। তবু কাজের আশায় গতকাল ঢাকার মানিকনগর থেকে পায়ে হেঁটে তোপখানা রোডে এসেছিলেন টাইপরাইটার নূরনবী হোসেন। কিন্তু সেই আশার গুড়ে বালি।

কিছুক্ষণ বসে থেকে আবার হেঁটে হেঁটে চলে যান তিনি। কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাই বলায় আকরামুল পুরোনো মুদ্রাক্ষরিক আলী আহমেদের মোবাইল নম্বর দেন। বিকেলে ফোন করে পরিচয় দিতেই আলী আহমেদ বলেন, ‘৩০ বছর ধরে তোপখানা রোডে আসছি। এমন খারাপ সময় কখনো আসেনি, যদিও অনেক আগে থেকেই আমাদের দিন খারাপ হয়ে আছে।

টাইপ করতে কেউ আসেন না। সব খেয়ে ফেলেছে কম্পিউটার। তবে মাঝে মাঝে নোটারি করতে লোক আসেন। আইনজীবীদের মাধ্যমে তা করাতে হয়। গ্রাহকদের কাছ থেকে যা পাওয়া যায়, তা থেকে আইনজীবীরা আমাদের একটা অংশ দেন। তাতে কোনো দিন ২০০ টাকা, কোনো দিন ৩০০ টাকা পাই।

ভাগ্য ভালো থাকলে ৫০০ টাকাও পাওয়া যায় কোনো কোনো দিন। এই আয় থেকে চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসার একটা ভাড়াও দিতে হয় সিটি করপোরেশনকে।’ কিন্তু এখন তো সবই বন্ধ। ফলে দোকান ভাড়াই কী দেবেন, আবার বাড়ি ভাড়াই কী দেবেন—তা নিয়ে চিন্তিত আলী আহমেদ। তিন বেলা খাওয়ার ব্যবস্থা কীভাবে করবেন—সেই চিন্তায় দিশেহারা তিনি।

বলেন, ‘জীবনে আর কিছু শিখিনি। বয়স হয়েছে, শেখার সুযোগও নেই আর। কিন্তু পেটটা তো আছে। পেট তো বন্ধ নেই, কামড় দেয় ক্ষুধা।’ আলী আহমেদের পাঁচ ছেলেমেয়ের মধ্যে দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। এক মেয়ে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছেন। ১০ বছর বয়সী একটা প্রতিবন্ধী ছেলে আছে। তিনি বলেন, ‘শুনেছি, প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের ভাতা দেয় সরকার। আমার ছেলেটা পায় না।’