হতদরিদ্রদের বরাদ্দ টাকায় দলীয় ভাগ

বাংলাদেশ

ঈদ ও করোনাকালে বিশেষ ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক টাকা দলের লোকরা নিয়ে নিচ্ছে। বিশেষ ত্রাণ সহায়তায় দলকে কোটা দেওয়ার কোনো আইন না থাকলেও রাজশাহী জেলাসহ বিভাগের অধিকাংশ জেলায় এভাবেই চলছে সহায়তা ভাগাভাগি।

বরাদ্দ থেকে হতদরিদ্রদের মাথাপিছু ৪৫০ টাকা করে দিতে বলা হয়েছে। আর করোনা সহায়তা মাথাপিছু ৫০০ টাকা। এ ব্যাপারে রাজশাহী জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আমিনুল হক বলেন, এসব সহায়তা হতদরিদ্র মানুষদের জন্য। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই এলাকা ভিত্তিতে বণ্টন করবেন গরিব মানুষদের মাঝে।

কাউকে দলীয় কোটা দেওয়ার বিষয়ে সরকারি কোনো নির্দেশনা নেই। রাজশাহীর গোদাগাড়ী পৌরসভায় বিশেষ ভিজিএফের ৪ হাজার ৬২১টি কার্ডের বিপরীতে ২০ লাখ ৭৯ হাজার ৪৫০ টাকা বরাদ্দ এসেছে। ৩০ এপ্রিল পৌর পরিষদের সভার সিদ্ধান্তক্রমে পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি অয়েজুদ্দিন বিশ্বাসকে দলীয় কোটা হিসেবে ২ হাজার কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

এই কার্ড বাবদ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা দলীয় কোটায় ২ হাজার কার্ডের বিপরীতে ৯ লাখ টাকা পাবেন। পৌরসভার প্যানেল মেয়র মোহাম্মদ ওবাইদুল্লাহ জানান, দলীয় নেতারা তাদের কাছে কোটা চাইলে তারা পরিষদের সভা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নেতাদের কাছ থেকে দলীয় কার্ডের তালিকা পেলে তারা টাকা বুঝিয়ে দেবেন।

পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি অয়েজুদ্দিন বিশ্বাস বলেন, তারা এখনো দলীয় তালিকা দেননি। তবে দলীয় কোটায় কার্ড পাওয়ার কথা তিনি স্বীকার করেন। জানা গেছে, গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলার প্রতিটি পৌরসভা ও ইউপিতে বরাদ্দ হওয়া ভিজিএফ কার্ডের একাংশ দলীয় কোটা হিসেবে নিচ্ছেন স্থানীয় নেতারা। জেলার বাগমারা, পবা ও মোহনপুর, বাঘা ও চারঘাটেও ভিজিএফের দলীয় কোটা নিচ্ছেন ক্ষমতাসীন নেতারা।

একাধিক ইউপি চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করে এই তথ্য জানিয়েছেন। তারা বলছেন তারা অসহায়। তাদের কিছু করার নেই। রাজশাহী জেলার একটি সিটি করপোরেশন, ১৪ পৌরসভা ও ৭১টি ইউনিয়নের জন্য ঈদ উপলক্ষ্যে বিশেষ সহায়তা হিসেবে মোট ৯ কোটি টাকা এসেছে। জনসংখ্যার অনুপাতে বরাদ্দ বণ্টন করা হয়েছে। অন্যদিকে করোনা সহায়তা হিসেবে এসেছে ৬০ লাখ টাকা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার পাকা ইউপি চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন জানান, তার ইউনিয়নে স্পেশাল ভিজিএফ এসেছে ১ হাজার ৬৬১টি। এর মধ্যে উপজেলা চেয়ারম্যান দলীয় কোটায় ১০০টি নিয়েছেন। অন্যদিকে এমপি নিয়েছেন ৩০০টি। বাকি ১ হাজার ৩৬১টি কার্ড তিনি এলাকার গরিব মানুষদের মাঝে বিতরণ করছেন। দলীয় কোটার তালিকা পেলে তিনি টাকা বুঝিয়ে দেবেন।

জানা গেছে, শিবগঞ্জ উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১৬টি ইউনিয়নে ৪১ হাজার ২৫৫ কার্ডের বিপরীতে বরাদ্দ এসেছে ১ কোটি ৮৫ লাখ ৬৪ হাজার ৭৫০ টাকা। পাশাপাশি মাথাপিছু ৫০০ টাকা করে করোনা সহায়তা এসেছে ৮ হাজার কার্ড। করোনা সহায়তা খাতে শিবগঞ্জে ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছে।

অভিযোগে জানা গেছে, অধিকাংশ ইউনিয়নের বরাদ্দ থেকে শতকরা ১০ থেকে ২০ ভাগ কাটা হচ্ছে দলীয় কোটা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের এমপি ডা. সামিল উদ্দিন আহম্মেদ শিমুল অসুস্থ থাকায় তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। শিবগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলাম এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

নওগাঁর নজিপুর পৌরসভায় বরাদ্দকৃত ৪ হাজার ১ কার্ডের মধ্যে ১ হাজার কার্ড দলীয় কোটা হিসেবে দেওয়া হয়েছে। নজিপুর সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাদেকুদ্দীন জানিয়েছেন তার ইউনিয়নে বরাদ্দকৃত স্পেশাল ভিজিএফের ৭০৩টি কার্ডের মধ্যে তিনি শতকরা ৩০ ভাগ দলীয় কোটা দিয়ে দিয়েছেন।

৫০০ করোনা কার্ডেরও ৩০ ভাগ দলীয় কোটা দিতে হয়েছে। সরকারি কোনো নির্দেশনা না থাকার পরও কেন দলীয় কোটা দিচ্ছেন জানতে চাইলে ইউপি চেয়ারম্যান সাদেকুদ্দীন বলেন, উপজেলা পরিষদের সভা থেকে তাদের মৌখিকভাবে দলীয় কোটা নিশ্চিতের নির্দেশ দেওয়া হয়। ফলে তার মতো সব ইউপি চেয়ারম্যানই তা করতে বাধ্য হয়েছেন।

হতদরিদ্রদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি সহায়তায় দলীয় নেতাদের ভাগ বসানোর প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) ড. হুমায়ুন কবীর যুগান্তরকে বলেন, এসব বিশেষ সহায়তা শুধু হতদরিদ্র ও গরিব মানুষদের জন্য। জনপ্রতিনিধিরাই তালিকা তৈরি করে দেবেন-এটাই সরকারি নির্দেশনা। কেন চেয়ারম্যান-মেয়ররা দলীয় কোটা দিচ্ছেন সেটা তারাই জানেন। কেউ তার কাছে এ নিয়ে অভিযোগ করেননি বলে জানান তিনি।