ঈদযাত্রায় আটকে আছে দক্ষিণ

বাংলাদেশ

‘লকডাউন কি খালি মোগো লইগ্যা? বেইন্যা হালে সূর্য ওডার আগে আইছি ফেরি ঘাডে। এহন দুফার ১২টা বাজে। লঞ্চ, স্প্রিংবোট, ফেরি কিচ্ছু নাই। বউডার অসুক। এক বচ্ছর ধইর‌্যা বাড়ি যাই না। চিটাগাং, রাজশাহী, রংপুরের মানুষ তো ঠিকই যাইতে লাগছে। মোড়া আটকা পড়ছি পদ্মার কারণে। বাস দেহি সব জাগায়ই চলে। ঠাডা পড়লে খালি মোগো লনছে?’

ক্ষোভের সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন রফিক মিয়া। বাড়ি ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায়। ঢাকায় চাকরি করেন সায়েদাবাদ এলাকায় একটি মোটর পার্টসের দোকানে। করোনার কারণে এক বছরেরও বেশি সময় বাড়ি যাওয়া হয়নি। স্ত্রীর অসুখের খবর শুনে আর পারেননি থাকতে।

জুরাইন থেকে ভেঙে ভেঙে শিমুলিয়া ফেরিঘাট পর্যন্ত আসতে খরচ হয়েছে ৭শ টাকা। এখন আর পার হতে পারছেন না নদী। ঈদযাত্রা ঠেকাতে সীমিত করে দেওয়া হয়েছে ফেরি পারাপার। ২-১টা যাও চলছে তাতে হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে ঠেলা-ধাক্কায় জিতে উঠতে পারেননি রফিক।

রফিকের মতোই হাজার হাজার মানুষের ক্ষোভ এখন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। ফরিদপুরের ভাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা হোসেন মুন্সি বলেন, ‘বাস না চললেও কয়েকজন মিলে মাইক্রোবাস কিংবা প্রাইভেট কার ভাড়া করে দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই যাচ্ছে মানুষ। নিম্ন আয়ের মানুষরা আশ্রয় নিচ্ছে পিকআপ কিংবা ট্রাকের।

অথচ আমরা আটকে আছি পদ্মার কারণে। এখানে ভিড় ঠেকাতে ফেরি বন্ধ করা থেকে শুরু করে ঘাটে বিজিবি পর্যন্ত মোতায়েন করা হয়েছে। অথচ কই সড়ক পথে তো কোনো চেকপোস্ট দেখলাম না। এই যে ঢাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে তাদের তো কেউ আটকাচ্ছে না।

করোনা কি কেবল আমরা পদ্মার দক্ষিণ পাড়ে যারা থাকি তারাই নিয়ে যাব? অন্য কোনো এলাকায় করোনা যাবে না?’ ফেরিঘাটে আটকা পড়া এসব মানুষের অভিযোগের সত্যতা মেলে রাজধানী থেকে বেরোনোর বিভিন্ন পথসহ দূরপাল্লার মহাসড়কগুলোতে। যমুনা সেতু পার হওয়ার পরপরই চোখে পড়ে বিশাল যানজট। গাড়ি আর এগোচ্ছে না।

যমুনা সেতুর অ্যাপ্রোচ থেকে পাবনার মোড় পর্যন্ত প্রায় ৩৫ কিলোমিটার এলাকায় এভাবেই যানবাহনের ভিড়ে জট লেগে থাকে রাত ১২টা পর্যন্ত। এরপর গাড়ি চলতে শুরু করলেও গতি ছিল প্রচণ্ড ধীর। এই জটেও চোখে পড়ে অসংখ্য যাত্রীবাহী পিকআপ, ট্রাক ও ছোট ছোট গাড়ি। দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামসহ উত্তরাঞ্চলের অন্য কোনো এলাকায় যাওয়ার ক্ষেত্রেও একইভাবে কোনোরকম বাধার সম্মুখীন হচ্ছে না সড়কপথের কোনো যানবাহন।

বরিশাল নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘এক জেলার মানুষের অন্য জেলায় যাওয়া আটকাতেই আন্তঃজেলার বাস এবং লঞ্চ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে সরকার। কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হয়নি। ভেঙে ভেঙে হলেও বাসে চেপে ঠিকই শত শত মাইল দূরত্বের গন্তব্যে পৌঁছুচ্ছে মানুষ।

কিন্তু জটিলতা হয়েছে বরিশাল-খুলনা তথা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে। এফবিসিসিআইর পরিচালক ও বরিশাল মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি নিজামউদ্দিন বলেন, ঈদে বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে যেতে পারেনি এ রকম একটা মানুষ আমায় দেখাতে পারবেন?

সবাই যাচ্ছে অথচ আটকে গেছে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। সে ফ পদ্মার কারণে। কই যমুনা, ভৈরব কিংবা দাউদকান্দি সেতুতে তো কাউকে আটকানো হচ্ছে না। দেশের কোনো মহাসড়কে তো এখন আর কোনো চেকপোস্ট নেই। অথচ আমাদের আটকাতে বিজিবি পর্যন্ত মোতায়েন করা হয়েছে। আমি মনে করি সবকিছু যখন চলছে তখন লঞ্চও ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল।

এর আগে স্বাস্থ্যবিধি মেনে লঞ্চ চলেনি? এবারও কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে লঞ্চ চলাচলের অনুমতি দিলে ধারণ ক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী নিয়ে ডাবল, ট্রিপল এমনকি ৪ বার করে স্পেশাল সার্ভিস দিয়ে লঞ্চ চলতে পারত। সেক্ষেত্রে আর যাই হোক ফেরিতে যেভাবে গাদাগাদি করে মানুষ গিয়ে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি হাজার গুণ বাড়িয়ে দিল তেমন পরিস্থিতি হতো না।

ছেলেদের সঙ্গে ঈদ করতে চান বৃদ্ধাশ্রমে থাকা মা

ছেলেদের সঙ্গে ঈদ করতে চান বৃদ্ধাশ্রমের জহুরা আলতা বানু। বয়স ৭০ বছর। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার মসজিদ পাড়ার বাসিন্দা ছিলেন। তার বিবাহিত জীবনে নিজের কোনো সন্তান নেই। স্বামী কতদিন আগে মারা গেছেন তা-ও বলতে চান না ক্ষোভে। কবে প্রায় ছয় বছর ধরে বৃদ্ধাশ্রমে রয়েছেন।

আলতা বানু জানান, স্বামী মারা যাওয়ার পর যা সম্পদ ছিল সবটুকু পালিত ছেলেকে লিখে দেন। এরপর থেকে পালিত ছেলে আর তার খোঁজখবর রাখেননি। ফলে বাধ্য হয়ে আসতে হয় বৃদ্ধাশ্রমে।

জহুরা বেগম (৭৫) নামের আরেক বৃদ্ধা জানালেন, তিনি পাঁচ বছর ধরে মহানন্দা প্রবীণ নিবাস বৃদ্ধাশ্রমে রয়েছেন। স্বামী ও ঘর-সংসার সবই ছিল তার। কিন্তু স্বামী এবং ছেলেদের অত্যাচারে তিনি বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন। স্বামী মারা যান দেড় বছর আগে। তারপরে ছেলেরা তার খোঁজ রাখেননি। শুধুমাত্র এক মেয়ে মাঝেমধ্যে এসে খবর নিয়ে যান।

তিনি অঝোরে কেঁদে কেঁদে বলেন, ‘ছেলেরা যদি আমাকে বাড়িতে নিয়ে যায়, তবে আমি রোজার ঈদ তাদের সঙ্গে করতে চাই। তবে কেউ নিতে যায় না। বছরের পর বছর আশায় থাকি হয়তোবা কোনো সন্তান এসে নিয়ে যাবে। কিন্তু কেউ আসে না। তবে এখানে যারা দেখাশোনা করেন সবাই আন্তরিক।’

একই কথা শোনান স্বামীহারা আসমা (৬৫)। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে ছিল। ছেলে মারা গেছেন অনেক আগে। আর মেয়ের বিয়ে হয় অন্যত্র। সে ঘরের নাতনি এসে তাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যান দেড় বছর আগে। তখন থেকে তিনি এখানেই রয়েছেন।

সুফিয়া (৭০) নামের এক বৃদ্ধা জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ রেহায়চর তার বাড়ি ছিল। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান মারা যাওয়ার কিছু দিন পরেই মারা যান তার স্বামী। এরপর হতেই তিনি ভাইদের বাড়িতেই থাকছিলেন। কিন্তু তার যেটুকু সম্পদ ছিল তার ভাইয়েরা লিখে নেয়ার পর রেখে গেছেন বৃদ্ধাশ্রমে।

আজাইপুর এলাকার কালু মণ্ডল (৭০) জানান, তিনি দুই বছর ধরে এই বৃদ্ধাশ্রমে রয়েছেন। তার একজন প্রতিবন্ধী মেয়ে এবং ছেলে রয়েছে। ছেলে এবং স্ত্রী তার সব সম্পদ লিখে নিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এরপর থেকে তার ঠিকানা হয় এই বৃদ্ধাশ্রমে। তিনি বলেন, জমি লিখে দেয়ার পর থেকে তার ওপর অত্যাচার শুরু করেন ছেলে এবং স্ত্রী।

আলিনগরের বাসিন্দা এবু আলী (৮০) বলেন, ‘মহানন্দা প্রবীণ নিবাসে শিশুকালের মতোই আমাদের সেবাযত্ন করা হয়। আমরা কোনো কিছুর অভাব বুঝতে পারি না। এখানে আমাদের সব কিছুর ব্যবস্থা রয়েছে। অসুখ হলে চিকিৎসকরা এসে চিকিৎসা দেন। মনে হচ্ছে নিজ বাড়ির চেয়ে অনেক ভালোই আছি এখানে।’

কথা হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ (দক্ষিণ শহর) প্রবীণ নিবাসের (বৃদ্ধাশ্রম) ম্যানেজার আলিউর রেজা আলমের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘২০১৬ সালে সমাজসেবার অনুমোদন নিয়ে জেলার ১৮ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির উদ্যোগে সাড়ে তিন বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা হয় বৃদ্ধাশ্রমটি।

বর্তমানে এখানে ১২ জন নারী ও চারজন পুরুষ রয়েছেন। তাদের থাকার জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা ওয়ার্ড এবং আলাদা বিছানা। তাদের কাপড় থেকে শুরু করে খাবার যাবতীয় যা প্রয়োজন সব কিছু বহন করা হয় এই বৃদ্ধাশ্রমে। তাদের রুটিন করে খাবার দেয়া হয়।’

তিনি আরও জানান, বৃদ্ধাশ্রমটির দ্বিতীয় তলার কাজ চলছে। সে কাজ করতে গিয়ে বেশ কিছু টাকা দেনা রয়েছে। কাজ শেষ হলে আরও অসহায় বৃদ্ধদেরও রাখা সম্ভব হবে। তার দাবি, সমাজসেবা অধিদফতর থেকে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয় তা খুবই সামান্য। ওই বরাদ্দ দিয়ে কিছুই হয় না।