মধ্যেরাতেও ফেরিঘাটে বাড়ি ফেরা মানুষের ঢল

বাংলাদেশ

যাত্রীদের ঢল নেমেছে। গত কয়েকদিন ধরে ঘাটে মানুষের ভিড় থাকলেও সোমবার (১০ এপ্রিল) তা আরও বেড়েছে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ঘরে ফেরা মানুষের ভিড়ের কারণে পা রাখার ঠাঁই ছিল না। স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে যাত্রীরা নদীর স্রোতের মতো বাড়ি ফিরছেন।

তবে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় আরও বাড়তে থাকে। এদিন মধ্যেরাতেও ঘাট এলাকায় ছিল জনস্রোত। রাতে পৌনে ২টায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ঈদে ঘরমুখো মানুষের জনস্রোত অব্যাহত ছিল। ফেরিগুলোতে যানবাহন ঠাঁই পাচ্ছিল না জনস্রোতের কারণে। দিনের বেলায় বিকালে চারটি ফেরি চলাচল করলেও রাতে ১৫টি ফেরি সচল ছিল।

তবে একটি ফেরি কিছু সময় বিকল থাকায় ১৪টি ফেরি দিয়েই ঘরমুখো মানুষ এবং পণ্যবাহী ট্রাক ও অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি যান পারাপার করা হয়। ঘাটে দায়িত্বরত পুলিশ সার্জেন্ট সোহরাব হোসেন বলেন, রাতের বেলায় এতো মানুষ কোথা থেকে আসছে, বুঝতে পারি না।

ফেরিঘাটে মানুষ আর মানুষ। ট্রাফিক ইন্সপেক্টর হাফিজুর রহমান জানান, রাত পৌনে ২টার দিকে ২ নম্বর ঘাট থেকে ফেরি রায়পুরা রওনা হয়। বিশাল এই ফেরিতে সবই মানুষ। শুধু দুটি ট্রাক এবং আটটি ছোট যান কোন ক্রমে স্থান পায়।

ঘাটে এখনও চার শতাধিক ট্রাক এবং ৮০টি ছোট যান পারাপারের অপেক্ষায়। লৌহজং উপজেলা নির্বাহী অফিসার হুমায়ুন কবির জানান, জরুরি পরিসেবা ছাড়া ফেরি চলাচল বন্ধ এবং রাতে পণ্যবাহীবাহী ট্রাক পারাপারের ঘোষণার পরও অনেকেই বুঝতে না পেরে ঘাটে রওনা হয়ে বিড়ম্বনায় পড়ছেন।

অনেকে ফেরতও যাচ্ছেন। আর যারা পার হচ্ছেন- অনেক কষ্ট করছেন। ফেরি বন্ধের কঠোর ঘোষণা ও বিজিবি মোতায়েন করেও শিমুলিয়া ঘাট দিয়ে ঘরমুখো মানুষের স্রোত ঠেকানো যাচ্ছে না।

ছেলেদের সঙ্গে ঈদ করতে চান বৃদ্ধাশ্রমে থাকা মা

ছেলেদের সঙ্গে ঈদ করতে চান বৃদ্ধাশ্রমের জহুরা আলতা বানু। বয়স ৭০ বছর। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার মসজিদ পাড়ার বাসিন্দা ছিলেন। তার বিবাহিত জীবনে নিজের কোনো সন্তান নেই। স্বামী কতদিন আগে মারা গেছেন তা-ও বলতে চান না ক্ষোভে। কবে প্রায় ছয় বছর ধরে বৃদ্ধাশ্রমে রয়েছেন।

আলতা বানু জানান, স্বামী মারা যাওয়ার পর যা সম্পদ ছিল সবটুকু পালিত ছেলেকে লিখে দেন। এরপর থেকে পালিত ছেলে আর তার খোঁজখবর রাখেননি। ফলে বাধ্য হয়ে আসতে হয় বৃদ্ধাশ্রমে।

জহুরা বেগম (৭৫) নামের আরেক বৃদ্ধা জানালেন, তিনি পাঁচ বছর ধরে মহানন্দা প্রবীণ নিবাস বৃদ্ধাশ্রমে রয়েছেন। স্বামী ও ঘর-সংসার সবই ছিল তার। কিন্তু স্বামী এবং ছেলেদের অত্যাচারে তিনি বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন। স্বামী মারা যান দেড় বছর আগে। তারপরে ছেলেরা তার খোঁজ রাখেননি। শুধুমাত্র এক মেয়ে মাঝেমধ্যে এসে খবর নিয়ে যান।

তিনি অঝোরে কেঁদে কেঁদে বলেন, ‘ছেলেরা যদি আমাকে বাড়িতে নিয়ে যায়, তবে আমি রোজার ঈদ তাদের সঙ্গে করতে চাই। তবে কেউ নিতে যায় না। বছরের পর বছর আশায় থাকি হয়তোবা কোনো সন্তান এসে নিয়ে যাবে। কিন্তু কেউ আসে না। তবে এখানে যারা দেখাশোনা করেন সবাই আন্তরিক।’

একই কথা শোনান স্বামীহারা আসমা (৬৫)। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে ছিল। ছেলে মারা গেছেন অনেক আগে। আর মেয়ের বিয়ে হয় অন্যত্র। সে ঘরের নাতনি এসে তাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যান দেড় বছর আগে। তখন থেকে তিনি এখানেই রয়েছেন।

সুফিয়া (৭০) নামের এক বৃদ্ধা জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ রেহায়চর তার বাড়ি ছিল। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান মারা যাওয়ার কিছু দিন পরেই মারা যান তার স্বামী। এরপর হতেই তিনি ভাইদের বাড়িতেই থাকছিলেন। কিন্তু তার যেটুকু সম্পদ ছিল তার ভাইয়েরা লিখে নেয়ার পর রেখে গেছেন বৃদ্ধাশ্রমে।

আজাইপুর এলাকার কালু মণ্ডল (৭০) জানান, তিনি দুই বছর ধরে এই বৃদ্ধাশ্রমে রয়েছেন। তার একজন প্রতিবন্ধী মেয়ে এবং ছেলে রয়েছে। ছেলে এবং স্ত্রী তার সব সম্পদ লিখে নিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এরপর থেকে তার ঠিকানা হয় এই বৃদ্ধাশ্রমে। তিনি বলেন, জমি লিখে দেয়ার পর থেকে তার ওপর অত্যাচার শুরু করেন ছেলে এবং স্ত্রী।

আলিনগরের বাসিন্দা এবু আলী (৮০) বলেন, ‘মহানন্দা প্রবীণ নিবাসে শিশুকালের মতোই আমাদের সেবাযত্ন করা হয়। আমরা কোনো কিছুর অভাব বুঝতে পারি না। এখানে আমাদের সব কিছুর ব্যবস্থা রয়েছে। অসুখ হলে চিকিৎসকরা এসে চিকিৎসা দেন। মনে হচ্ছে নিজ বাড়ির চেয়ে অনেক ভালোই আছি এখানে।’

কথা হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ (দক্ষিণ শহর) প্রবীণ নিবাসের (বৃদ্ধাশ্রম) ম্যানেজার আলিউর রেজা আলমের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘২০১৬ সালে সমাজসেবার অনুমোদন নিয়ে জেলার ১৮ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির উদ্যোগে সাড়ে তিন বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা হয় বৃদ্ধাশ্রমটি।

বর্তমানে এখানে ১২ জন নারী ও চারজন পুরুষ রয়েছেন। তাদের থাকার জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা ওয়ার্ড এবং আলাদা বিছানা। তাদের কাপড় থেকে শুরু করে খাবার যাবতীয় যা প্রয়োজন সব কিছু বহন করা হয় এই বৃদ্ধাশ্রমে। তাদের রুটিন করে খাবার দেয়া হয়।’

তিনি আরও জানান, বৃদ্ধাশ্রমটির দ্বিতীয় তলার কাজ চলছে। সে কাজ করতে গিয়ে বেশ কিছু টাকা দেনা রয়েছে। কাজ শেষ হলে আরও অসহায় বৃদ্ধদেরও রাখা সম্ভব হবে। তার দাবি, সমাজসেবা অধিদফতর থেকে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয় তা খুবই সামান্য। ওই বরাদ্দ দিয়ে কিছুই হয় না।