পদ্মায় ডুবে যাওয়া সেই মাইক্রোবাসের নিখোঁজ চালকের লাশ উদ্ধার

বাংলাদেশ

দৌলতদিয়ার ৫নং ফেরিঘাটে পল্টুনের তার ছিঁড়ে পদ্মা নদীতে মাইক্রোবাস ডুবে যাওয়ার ঘটনায় নিখোঁজ চালকের লাশ উদ্ধার হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৭টায় আদর গ্রামের বাবলু মাতব্বর নদীর ধারে হাঁটতে গিয়ে একটি লাশ পড়ে থাকতে দেখে।

পরে নৌ পুলিশ ফাঁড়ির অফিসার ইনচার্জ মো: মোন্নাফ শেখকে জানান তিনি। ঘটনাস্থলে মাইক্রোবাসচালকের বড় ভাই ফারুক হোসেন, ছোট ভাই শাহীন হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে আসলে লাশটি মাইক্রোচালকে মারুফ হোসেনের (৪২) বলে শনাক্ত করেন তারা।

মারুফের বাড়ি সিলেট জেলার জকিগঞ্জ থানার সুন্দরের চক গ্রামে। ৩ কন্যাসন্তানের জনক তিনি। মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১ টায় দৌলতদিয়ার ৫নং ফেরিঘাটে ঝড়ের আঘাতে পল্টুনের তার ছিঁড়ে নদীতে পড়ে ডুবে যায় সাদা রঙের মাইক্রোবাসটি। বেলা দেড়টার দিকে মাইক্রোটিকে উপরে তুলতে সক্ষম হন উদ্ধারকারী দল।

উদ্ধারের পর মাইক্রোবাসের ভেতর কাউকেই পাওয়া যায়নি। মাইক্রোটিতে অন্য কোন যাত্রী ছিল কিনা তা নিশ্চিত করা যায়নি তখন। ডুবন্ত মাইক্রোটি থেকে চালক হাত নাড়িয়ে সাহায্য চাইছিলেন বলে জানান একজন প্রত্যক্ষদর্শী। এরপর চালকের খোঁজে উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রাখে উদ্ধারে জন্য ফায়ার সার্ভিস ও ডুবুরি দল।

ঢাকা মিরপুর বাংলা কলেজের ছাত্র জাহিদ হাসান জানান, তিনি পাটুরিয়া ঘাট হতে শাপলা-শালুক ফেরিযোগে দৌলতদিয়া ঘাটের উদ্দেশ্যে আসছিলেন। ঘাটের কাছাকাছি আসলে তাদের ফেরিটি ঝড়ের কবলে পড়ে। চালক দক্ষতার সঙ্গে ফেরিটি ৫নং ঘাটে ভেড়াতে সক্ষম হন।

এ সময় আমাদের চোখের সামনেই পল্টুনের তার ছিঁড়ে গেলে পল্টুনের ওপর থাকা মাইক্রোবাসটি প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। ডুবে যাওয়ার আগ মুহূর্তে মাইক্রোর চালক সাহায্যের জন্য হাত নাড়লেও তাকে সাহায্য করার মতো কোনো অবস্থা কারো ছিল না।

শিহাবের কথা মনে হলে কেঁদে উঠছে ইউএনওর মন

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরীন চৌধুরী দাফতরিক কাজে ব্যস্ত। মঙ্গলবার (৫ মে) বিকেল ৪টার ঘটনা। হঠাৎ নিষ্পাপ চেহারা আর আদুরে একটি শিশু খালি পায়ে ইউএনওর কক্ষে প্রবেশ করে। শিশুর হাতে ছিল একটি ময়লা থলে।

কক্ষে ঢুকেই সে ইউএনওর কাছ থেকে সাহায্য চেয়ে হাত বাড়িয়ে দেয়। এতে অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন ইউএনও সাবরীন চৌধুরী। শিশুটির নাম শিহাব।কথা বলে জানতে পেরে সারাদিন অভুক্ত শিহাবকে খাবারের ব্যবস্থা করে দেন।

দাফতরিক কাজ শেষে শিহাবকে নিয়ে ইউএনও বেরিয়ে পড়েন দক্ষিণ চরমোহনা ইউসুফ মেমোরিয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকায়। শিহাব বলেছিল সে স্কুলটির দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র।

ঈদের নতুন জামার লোভে শিহাব সবার কাছে টাকা চেয়েছে শুনে পথে গাড়ি থামিয়ে তার পছন্দমতো শার্ট-প্যান্ট ও এক জোড়া জুতা কিনে দিয়েছেন ইউএনও। অবশেষে শিহাবের মুখে শোনা স্কুলের সামনে পৌঁছালো ইউএনওর গাড়ি। কিন্তু সেখানে কেউই শিহাবকে চেনে না।

অনেক বুঝানোর পর শিহাব বলে ওঠে তার বাড়ির নাম ‘বকুল হুজুরের বাড়ি/জিনাত আলী হুজুরের বাড়ি।’ সেখানকার লোকজন তখন ঠিকানাটি নিশ্চিত করে। সন্ধ্যার আগেই শিহাবের বাড়ি সদর উপজেলার দালাল বাজার ইউনিয়নে উপস্থিত হন ইউএনও। মূলত শিহাবের বাড়ি রায়পুর নয়।

সেখানে গিয়ে ইউএনও জানতে পারেন, শিহাবের বাবা ৬-৭টি বিয়ে করেছেন। অনেক আগেই তাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তার মা কোনোমতে মানুষের বাড়িতে কাজ করে শিহাবকে নিয়ে বেঁচে আছেন। কিন্তু ছেলে ভিক্ষা করুক এটি তার মা কখনো চাননি।

এরমধ্যেই তার মা ছেলেকে পাওয়া গেছে শুনে ছুটতে ছুটতে বাড়ি আসেন। ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে ছেলের কর্মকাণ্ডে তিনি কাঁদতে থাকেন। এতে কেঁদে ওঠে ইউএনওর মনও। শিশুটির পুরো ঘটনাতে ইউএনওর মনে প্রশ্ন জাগে- এইটুকু শিশুর কাছে মাতৃমমতা প্রবঞ্চিত হলো?

এত ছোট বয়সে এতটা মিথ্যা সে কিভাবে রপ্ত করলো? এত ছোট বয়সেই এতটা সাহসিক সে কিভাবে হলো? এমন সব আবেগ আর প্রশ্নজড়িত শব্দ দিয়ে তৈরি বাক্যগুলো দিয়ে মঙ্গলবার (৫ মে) দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে ইউএনও তার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে পোস্ট করেন।

ইউএনও সাবরীন চৌধুরীর পোস্টের আংশিক লেখা ছিল এরকমই, ‘অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কার সাথে এসেছ, এতো ছোট বয়সে তুমি ভিক্ষাবৃত্তিতে কেন নেমেছ, কে শিখিয়ে দিয়েছে, বাবা-মা কোথায়, বাড়ি কোথায় ইত্যাদি।

উত্তরে শিহাব জানালো, সে একাই এসেছে, বাড়ি রাখালিয়া, বাবা নেই, মার নাম জানে না। খুব সকালে খেয়েছে, ক্ষুধা লেগেছে। শুনেই তাৎক্ষণিক তার খাবারের ব্যবস্থা করলাম। শিশুটিকে সামনে বসিয়ে হাতের কাজগুলো গুছানোর ফাঁকে মনে মনে চিন্তা করেছিলাম, কেমন মা?

কোলের শিশুটিকে এই পেশায় নামিয়েছে, কী এমন অবস্থা যে তাকে একলা ছেড়ে দিতে হলো। শিশুটির কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। খারাপ লোকের খপ্পরে পড়তে পারত। মাতো নিজেও আসতে পারত। এই শিশুটি বাড়ির ঠিকানা চেনে না, সে বাড়ি ফিরবে কিভাবে। আরও কত কী!

সন্ধ্যায় শিহাব নিজ আঙিনায় পা রাখতেই আশপাশে তার সমবয়সী সব শিশু দৌড়ে এল। সেও মহাখুশি। কিন্তু তার ছোট ঘরটিতে তালা ঝুলছিল। তাতে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আশপাশের বাড়ির লোকজনকে ডাকা হলে মোটামুটি সবাই সাড়া দিল।এতক্ষণ পর্যন্ত শিশুটির জন্য একটা শঙ্কা, একটা কষ্ট হচ্ছিল।

কিন্তু যখন জানতে পারলাম, শিশুটি আরও ছোট বয়স থেকেই এভাবে একা একা ভিক্ষা করতে বেরিয়ে যায়। বানিয়ে বানিয়ে কথা বলে, কখনো চাঁদপুর, কখনো রামগতি চলে যায়। এর জন্য অনেক মারধর খেয়েছে তবুও সংশোধন হয়নি। বাবা ৬-৭টা বিয়ে করে এদের ফেলে রেখে চলে গিয়েছে।

তার মা এদিক-সেদিক টুকটাক কাজ করে বেড়ায় কিন্তু ছেলে ভিক্ষা করুক তা চায় না। বুঝলাম, পরিবার এবং পরিবেশ সত্যিকার অর্থেই একটি শিশুর বেড়ে ওঠার পেছনে কার্যকর ভূমিকা রাখে। তবে আল্লাহ যেন শিশুটিকে হেদায়েত করে মায়ের কষ্ট ও মমতাকে বোঝার বোধটুকু দান করে।’

ইউএনও সাবরীন চৌধুরী জানান, শিশুটিকে ভালো করে বুঝিয়েছি। তার মাকেও একটু সতর্কতা বাড়ানোর জন্য বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপহার খাদ্যসামগ্রী তার মায়ের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। ভালো কোনো কিছুর ব্যবস্থা করে দিতে পারার আশায় তাদের ঠিকানা নিয়ে আসা হয়েছে।