একদিকে শান্তি চুক্তি, অন্যদিকে যুদ্ধ

আন্তর্জাতিক

বহু বছর ধরে অনানুষ্ঠানিক স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকার পর অবশেষে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ইসরায়েলের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক ‘শান্তি চুক্তি’ করেছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতায় দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্কের পথ প্রশস্ত করেছে।

এই চুক্তি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য চার বছর ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালানোর জন্য পুরস্কার বলা যেতে পারে। একবার স্বাক্ষরিত ও বাস্তবায়িত হওয়ার পরে এটি নেতানিয়াহু জোটকে সাহসী করে তুলবে, ইসরায়েলের দখলদারিকে আরও গভীর করবে এবং আরবের স্বৈরাচারী শাসকদের সঙ্গে ইসরায়েলের জোটকে শক্তিশালী করবে।

তবে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো শান্তি চুক্তিটিকে ‘ঐতিহাসিক অগ্রগতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং আরব আমিরাতের নেতারা বলছেন, এই চুক্তি ন্যায়সংগত। কারণ, এটা আরব ভূখণ্ডে ইসরায়েলি অধিগ্রহণ বন্ধ করবে, যা ফিলিস্তিনিদের তাদের স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জনে এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে।

এই চুক্তি করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ‘ফিলিস্তিনি অঞ্চলে আরও অধিগ্রহণ বন্ধ করার’ জন্য কৃতিত্ব পাওয়ার আশা করতে পারে, তবে পশ্চিম তীরের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা অবৈধভাবে অধিগ্রহণ করার নেতানিয়াহুর বহুদিনের পরিকল্পনা সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডি-ফ্যাক্টো নেতা আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদের উদ্যোগ নেওয়ার আগে থেকেই বন্ধ আছে।

যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাত বলছে, তারা ফিলিস্তিনি জনগণের মর্যাদা, অধিকার এবং তাদের নিজস্ব সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য লড়াইকে সমর্থন দেওয়া অব্যাহত রাখবে, কিন্তু এ নিয়ে সংশয় রয়েছে। ইসরায়েলের সঙ্গে গোপন সুরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টি আমিরাত দীর্ঘদিন ফিলিস্তিনিদের কাছে গোপন রেখেছে।

ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সময় বা শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে তাদের ইচ্ছার কথা ঘোষণা করার সময় তারা ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের সঙ্গে কোনো পরামর্শ বা সমন্বয় করেনি। প্রকৃতপক্ষে, তারা দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনের দুর্দশার দিকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল এবং দলত্যাগী ‘ফিলিস্তিনি নেতা’ মোহাম্মদ দাহলানকে প্রশ্রয় ও সমর্থন দিয়ে ফিলিস্তিনি ঐক্যকে দুর্বল করেছে।

ফিলিস্তিনি সমাজের সর্বস্তরের মানুষ যে আমিরাতের এই পদক্ষেপকে দ্ব্যর্থহীনভাবে নিন্দা করেছে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তারা এটিকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ ও ‘আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করেছে। ফিলিস্তিনিদের আশঙ্কা, ইসরায়েল তার এলাকা সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনি জনগণকে দমনের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সম্ভাব্য অন্যান্য আরব উদ্যোগকে কাজে লাগাবে।

অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ইসরায়েলের সীমান্ত নেই। ইসরায়েলি বাহিনী দ্বারা এটি কখনো হুমকির মুখে পড়েনি বা দখল করা হয়নি। নেতানিয়াহু একদিকে যেমন ফিলিস্তিনের ওপর নিজেদের আধিপত্য জোরালো করছে, তেমনি ‘দুই রাষ্ট্রের’ সমাধানকেও প্রত্যাখ্যান করছে।

ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েল আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও বেশি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড অধিগ্রহণ করার কাজে ব্যবহার করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে এই শান্তি চুক্তি ধনী আরব বাজারে ইসরায়েলের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবে।

আবুধাবি ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করলেও কার্যত ফিলিস্তিনের সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। যাঁরা ঐতিহাসিক ‘শান্তি চুক্তি’ উদ্‌যাপন করছেন, তাঁরা শিগগিরই আবিষ্কার করতে পারেন, এটি অন্য একটি আঞ্চলিক সংঘাত বা আরও খারাপ যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।

সূত্র: প্রথম আলো