এক সিলিন্ডারে শ্বাস নিচ্ছেন ৩ রোগী

আন্তর্জাতিক

পার্বতী দেবী, ওম দত্ত শর্মা ও দীপক; কিছুক্ষণ আগেও কেউ একে অপরকে চিনতেন না। অথচ ভাগ্যের এমনই পরিহাস যে অক্সিজেনের প্রয়োজনে, জীবন বাঁচানোর জন্য একাত্ম হয়েছেন তারা। বেড না পেয়ে হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে মাত্র এক সিলিন্ডার অক্সিজেনই ভাগাভাগি করে বাঁচার চেষ্টা করছিলেন এই তিনজন।

শনিবার (২৪ এপ্রিল) অক্সিজেন সংকটের মুখে দিল্লির জিটিবি হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটেছে। ওম দত্ত শর্মার পরিবারের স্বজনদের দাবি, হাসপাতালে একটিও স্ট্রেচার ছিল না যেখানে শোয়ানো যেতে পারে। মেঝেতে জায়গা ছিল। তাই সেখানেই রাখা হয়েছে।

এরপর হয়তো জায়গা না ও পেতে পারি। ওম দত্তের ১৮ বছরের দাদুর পাশে কাঁদছিলেন। কয়েক দিন আগেই ওম দত্তের ছেলে অর্থাৎ তার বাবা একইভাবে মারা গেছেন। বাবাকে হারানো রাতের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “এই হাসপাতালে কোনও বিছানা ছিল না। সিকিউরিটিরা আমাকে চলে যেতে বলেছিল।

কিন্তু শ্বাসকষ্টের জন্য বাবার মুখ দিয়ে রক্ত বেরতে শুরু করে। কোনোরকমে এখানে একটা অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবস্থা করতে পেরেছিলাম। কিন্তু আধ ঘণ্টার মধ্যে সব শেষ! প্রসঙ্গত, ভারতে করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির পাশাপাশি অক্সিজেন সংকটও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

শুক্রবার (২৩ এপ্রিল) রাতে ভারতের দিল্লির জয়পুর গোল্ডেন হাসপাতালে অক্সিজেন সংকটে ২০ করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে মোদি সরকারকে প্রয়োজনে চুরি করে হলেও অক্সিজেনের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছে দিল্লি হাইকোর্ট।

সব বন্ধ, পেট তো বন্ধ নেই, কামড় দেয় ক্ষুধাসব বন্ধ, পেট তো বন্ধ নেই, কামড় দেয় ক্ষুধা

রাজধানীর তোপখানা রোডের যে পাশে জাতীয় প্রেসক্লাব, ঠিক তার উল্টো দিকেই মুদ্রাক্ষরিকদের (টাইপরাইটার) ছোট ছোট দোকান। একই সঙ্গে আইনজীবীদের সহকারী হিসেবে নোটারি পাবলিক করিয়ে দেওয়ার কাজও করেন তাঁরা। বিনিময়ে আইনজীবীরা কিছু পান, বাকিটা নেন এসব সহকারী।

তবে দোকান মানে একটা কাঠের চেয়ার, একটা টেবিল আর একটা টুল। গতকাল মঙ্গলবার খাঁ খাঁ দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কাঠের চেয়ার-টেবিলগুলো ওলটানো। শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা এগুলো। মুদ্রণজগতে কম্পিউটারের প্রচলন শুরু হওয়ার পর থেকে এমনিতেই মুদ্রাক্ষরিকদের কাজ ও কদর কমে আসছে।

করোনাভাইরাস আসার পর তা এখন একেবারেই বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। ১৪ এপ্রিল দেশব্যাপী সর্বাত্মক লকডাউন শুরুর পর থেকে মুদ্রাক্ষরিকেরা সবাই ঘরবন্দী। কথা বলার একজন লোকও পাওয়া যায়নি গতকাল। সেখানে পাওয়া যায় মো. আকরামুল ইসলাম নামের একজনের, যাঁর একটি দোকান রয়েছে।

ওই দোকানে তিনি ফটোকপি ও মোবাইলে টাকা রিচার্জের পাশাপাশি মোবাইলে আর্থিক সেবা দাতা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট হিসেবেও কাজ করেন। বিকাশ, নগদ, রকেটের দোকান খুলতে যেহেতু বাধা নেই, তাই তিনি খুলেছেন। কিন্তু গ্রাহক নেই। তিনি জানান, ১৯৭৩ সালে ৬৫ জন মুদ্রাক্ষরিক এখানে বসা শুরু করেন। এখন আছেন ৩৪ জন।

তোপখানা রোড পেশাজীবী মুদ্রাক্ষরিক কল্যাণ সমিতির সদস্য তাঁরা। কাজ না থাকায় লোকগুলো খুবই কষ্টে আছেন। আকরামুল ইসলাম জানান, কাজ নেই, গ্রাহকও নেই। তবু কাজের আশায় গতকাল ঢাকার মানিকনগর থেকে পায়ে হেঁটে তোপখানা রোডে এসেছিলেন টাইপরাইটার নূরনবী হোসেন। কিন্তু সেই আশার গুড়ে বালি।

কিছুক্ষণ বসে থেকে আবার হেঁটে হেঁটে চলে যান তিনি। কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাই বলায় আকরামুল পুরোনো মুদ্রাক্ষরিক আলী আহমেদের মোবাইল নম্বর দেন। বিকেলে ফোন করে পরিচয় দিতেই আলী আহমেদ বলেন, ‘৩০ বছর ধরে তোপখানা রোডে আসছি। এমন খারাপ সময় কখনো আসেনি, যদিও অনেক আগে থেকেই আমাদের দিন খারাপ হয়ে আছে।

টাইপ করতে কেউ আসেন না। সব খেয়ে ফেলেছে কম্পিউটার। তবে মাঝে মাঝে নোটারি করতে লোক আসেন। আইনজীবীদের মাধ্যমে তা করাতে হয়। গ্রাহকদের কাছ থেকে যা পাওয়া যায়, তা থেকে আইনজীবীরা আমাদের একটা অংশ দেন। তাতে কোনো দিন ২০০ টাকা, কোনো দিন ৩০০ টাকা পাই।

ভাগ্য ভালো থাকলে ৫০০ টাকাও পাওয়া যায় কোনো কোনো দিন। এই আয় থেকে চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসার একটা ভাড়াও দিতে হয় সিটি করপোরেশনকে।’ কিন্তু এখন তো সবই বন্ধ। ফলে দোকান ভাড়াই কী দেবেন, আবার বাড়ি ভাড়াই কী দেবেন—তা নিয়ে চিন্তিত আলী আহমেদ। তিন বেলা খাওয়ার ব্যবস্থা কীভাবে করবেন—সেই চিন্তায় দিশেহারা তিনি।

বলেন, ‘জীবনে আর কিছু শিখিনি। বয়স হয়েছে, শেখার সুযোগও নেই আর। কিন্তু পেটটা তো আছে। পেট তো বন্ধ নেই, কামড় দেয় ক্ষুধা।’ আলী আহমেদের পাঁচ ছেলেমেয়ের মধ্যে দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। এক মেয়ে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছেন। ১০ বছর বয়সী একটা প্রতিবন্ধী ছেলে আছে। তিনি বলেন, ‘শুনেছি, প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের ভাতা দেয় সরকার। আমার ছেলেটা পায় না।’