ভারতে করোনা নিয়ে সিএনএনের রিপোর্টে ভয়াবহ তথ্য

আন্তর্জাতিক

ভারতে বিনা চিকিৎসায় করোনা রোগীর মৃত্যু ঘটছে প্রতিদিন। এ অবস্থার মধ্যেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএন-এ প্রকাশিত এক রিপোর্টে ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। যাতে বলা হয়েছে, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা নথিভুক্তের চেয়ে অনেক বেশি।

আর আক্রান্তের সংখ্যাও ৫০ কোটির বেশি হতে পারে। করোনায় বিপর্যস্ত এ ভারত বিগত বছরগুলোতে সামরিক খাত, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি আর আইপিএলে বাড়িয়েছে খরচ, যা নিয়েই এখন চলছে সমালোচনা। হলিউডের পরই বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ইন্ডাস্ট্রি বলিউড।

এখানে অহরহ হচ্ছে ৬০০ কোটি রুপির সিনেমা। আর একটি সিনেমার জন্য ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি রুপি ব্যয় খুবই সাধারণ ব্যাপার। বলিউড ছাড়াও বিভিন্ন রাজ্যে আরও অনেক ইন্ডাস্ট্রি আছে সেগুলোর চলচ্চিত্রের ব্যয়ও আকাশচুম্বী। আইপিএল, ভারতের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ক্রিকেট লিগ।

এখানে প্রতিটি দলের খরচ, সুযোগ-সুবিধা কোনো অংশেই একটি জাতীয় ক্রিকেট দলের কম নয়। কয়েক হাজার কোটি রুপির ব্যয় প্রতিটি আসরে হয় থাকে। গত ২০২০ সালে, ভারত বিশ্বে তৃতীয় দেশ যারা সামরিক খাতে সবচেয়ে বেশি খরচ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পরই দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশটির অবস্থান।

তাই কে বলবে অর্থনৈতিক মন্দায় ভুগছে দেশটি! চলচ্চিত্র, আইপিএল কিংবা সামরিক খাত কোথাও চোখ রাখলে বোঝার উপায় নেই ভারতের অর্থনৈতিক মন্দার বিষয়টি। এসব খাতে কমেনি খরচ বরং বেড়েছে। অথচ মন্দার ছোঁয়া ঠিকই লেগেছে চিকিৎসা খাতে।

এখন যেখানে রোজ সাড়ে তিন লাখের মতো রোগী শনাক্ত ও আড়াই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে- এমন সময় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে চিকিৎসাব্যবস্থা। নেই অক্সিজেনের যোগান, নেই আইসিইউ সুবিধা। বিনা চিকিৎসায় হাসপাতালের বাইরে রোগীর শেষ নিশ্বাস ত্যাগ নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাড়িতেও প্রাণ যাচ্ছে অনেক মানুষের। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বাস্তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ। আক্রান্তের হার প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে ঢের বেশি। অন্যদিকে মৃত্যুর সংখ্যাও প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে বেশি। সিএনএন-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমনটাই উঠে এসেছে।

এ অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতের ব্যয়বহুল বিভিন্ন আসরের সমালোচনা চলছে জোরেশোরে। বিশেষ করে এখনো আইপিএল কেন বন্ধ হচ্ছে না তা নিয়েই সমালোচনা তুঙ্গে। সামরিক খাতে বাজেট বাড়ানো আর বলিউডের ব্যয় নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

বিরোধীরা বলেছেন, ২০২০ সালের মহামারির আঁচ থেকে একটুও শিক্ষা নেয়নি নরেন্দ্র মোদি প্রশাসন। তাই চিকিৎসা খাতের কোনো উন্নয়নই করেনি তারা। আর তাই আজ নতুন ভ্যারিয়েন্টে মৃত্যু দুয়ারে দুয়ারে।

সব বন্ধ, পেট তো বন্ধ নেই, কামড় দেয় ক্ষুধাসব বন্ধ, পেট তো বন্ধ নেই, কামড় দেয় ক্ষুধা

রাজধানীর তোপখানা রোডের যে পাশে জাতীয় প্রেসক্লাব, ঠিক তার উল্টো দিকেই (টাইপরাইটার) ছোট ছোট দোকান। একই সঙ্গে আইনজীবীদের সহকারী হিসেবে নোটারি পাবলিক করিয়ে দেওয়ার কাজও করেন তাঁরা। বিনিময়ে আইনজীবীরা কিছু পান, বাকিটা নেন এসব সহকারী।

তবে দোকান মানে একটা কাঠের চেয়ার, একটা টেবিল আর একটা টুল। গতকাল মঙ্গলবার খাঁ খাঁ দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কাঠের চেয়ার-টেবিলগুলো ওলটানো। শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা এগুলো। মুদ্রণজগতে কম্পিউটারের প্রচলন শুরু হওয়ার পর থেকে এমনিতেই মুদ্রাক্ষরিকদের কাজ ও কদর কমে আসছে।

করোনাভাইরাস আসার পর তা এখন একেবারেই বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। ১৪ এপ্রিল দেশব্যাপী সর্বাত্মক লকডাউন শুরুর পর থেকে মুদ্রাক্ষরিকেরা সবাই ঘরবন্দী। কথা বলার একজন লোকও পাওয়া যায়নি গতকাল। সেখানে পাওয়া যায় মো. আকরামুল ইসলাম নামের একজনের, যাঁর একটি দোকান রয়েছে।

ওই দোকানে তিনি ফটোকপি ও মোবাইলে টাকা রিচার্জের পাশাপাশি মোবাইলে আর্থিক সেবা দাতা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট হিসেবেও কাজ করেন। বিকাশ, নগদ, রকেটের দোকান খুলতে যেহেতু বাধা নেই, তাই তিনি খুলেছেন। কিন্তু গ্রাহক নেই। তিনি জানান, ১৯৭৩ সালে ৬৫ জন মুদ্রাক্ষরিক এখানে বসা শুরু করেন। এখন আছেন ৩৪ জন।

তোপখানা রোড পেশাজীবী মুদ্রাক্ষরিক কল্যাণ সমিতির সদস্য তাঁরা। কাজ না থাকায় লোকগুলো খুবই কষ্টে আছেন। আকরামুল ইসলাম জানান, কাজ নেই, গ্রাহকও নেই। তবু কাজের আশায় গতকাল ঢাকার মানিকনগর থেকে পায়ে হেঁটে তোপখানা রোডে এসেছিলেন টাইপরাইটার নূরনবী হোসেন। কিন্তু সেই আশার গুড়ে বালি।

কিছুক্ষণ বসে থেকে আবার হেঁটে হেঁটে চলে যান তিনি। কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাই বলায় আকরামুল পুরোনো মুদ্রাক্ষরিক আলী আহমেদের মোবাইল নম্বর দেন। বিকেলে ফোন করে পরিচয় দিতেই আলী আহমেদ বলেন, ‘৩০ বছর ধরে তোপখানা রোডে আসছি। এমন খারাপ সময় কখনো আসেনি, যদিও অনেক আগে থেকেই আমাদের দিন খারাপ হয়ে আছে।

টাইপ করতে কেউ আসেন না। সব খেয়ে ফেলেছে কম্পিউটার। তবে মাঝে মাঝে নোটারি করতে লোক আসেন। আইনজীবীদের মাধ্যমে তা করাতে হয়। গ্রাহকদের কাছ থেকে যা পাওয়া যায়, তা থেকে আইনজীবীরা আমাদের একটা অংশ দেন। তাতে কোনো দিন ২০০ টাকা, কোনো দিন ৩০০ টাকা পাই।

ভাগ্য ভালো থাকলে ৫০০ টাকাও পাওয়া যায় কোনো কোনো দিন। এই আয় থেকে চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসার একটা ভাড়াও দিতে হয় সিটি করপোরেশনকে।’ কিন্তু এখন তো সবই বন্ধ। ফলে দোকান ভাড়াই কী দেবেন, আবার বাড়ি ভাড়াই কী দেবেন—তা নিয়ে চিন্তিত আলী আহমেদ। তিন বেলা খাওয়ার ব্যবস্থা কীভাবে করবেন—সেই চিন্তায় দিশেহারা তিনি।

বলেন, ‘জীবনে আর কিছু শিখিনি। বয়স হয়েছে, শেখার সুযোগও নেই আর। কিন্তু পেটটা তো আছে। পেট তো বন্ধ নেই, কামড় দেয় ক্ষুধা।’ আলী আহমেদের পাঁচ ছেলেমেয়ের মধ্যে দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। এক মেয়ে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছেন। ১০ বছর বয়সী একটা প্রতিবন্ধী ছেলে আছে। তিনি বলেন, ‘শুনেছি, প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের ভাতা দেয় সরকার। আমার ছেলেটা পায় না।’