বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছিলেন আগেই, শোনেনি ভারত সরকার

আন্তর্জাতিক

ভারতে করোনার নতুন ধরন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। নতুন এ ধরন অতি সংক্রামক। আগে থেকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। গত মার্চের শুরুতেই বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের গঠন করা একটি ফোরাম সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছিল।

তবে এ সতর্কবার্তায় কান দেয়নি সরকার। তারই চরম মূল্য দিতে হচ্ছে দেশটিকে। একদিনে চার লাখের বেশি শনাক্তের পাশাপাশি দেশটিতে ২৪ ঘণ্টায় করোনায় মৃত্যু ৩ হাজার ৫০০ ছাড়িয়েছে। ভারতের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্স।

সংবাদমাধ্যমটির কাছে ওই ফোরামের পাঁচ বিজ্ঞানী ভারত সরকারকে সতর্ক করেছিলেন বলে জানিয়েছেন।তাঁদের মতে, আগে থেকে সতর্ক হলে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে, ভারতকে আজ হয়তো এমন করুণ পরিস্থিতি দেখতে হতো না।

করোনা সংক্রমণ রোধে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে ইন্ডিয়ান সার্স-কোভ-২ জেনেটিকস কনসোর্টিয়াম বা আইএনএসএসিওজি নামে একটি উচ্চ পর্যায়ের ফোরাম কাজ করছে। গত ডিসেম্বরে এটি গঠন করা হয়।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতেই বিজ্ঞানীরা প্রথম করোনার ভারতীয় ধরন (বি.১.৬১৭) শনাক্ত করতে সক্ষম হন বলে জানান আইএনএসএসিওজির সদস্য অজয় পারিদা। তিনি ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ইনস্টিটিউট অব লাইফ সায়েন্সের পরিচালক।

এ ফোরামের একজন বিজ্ঞানী নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেন, মার্চের শুরুতেই সম্ভাব্য ভয়ংকর পরিণতির বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্র সরকারকে সতর্ক করা হয়েছিল। তবে এসব সতর্ক বার্তা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পৌঁছেছিল কিনা, তা নিশ্চিত নয়।

সরকারি নথিপত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ১০ মার্চের আগেই আইএনএসএসিওজি তার উদ্ভাবন ও সুপারিশ কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলে (এনসিডিসি) পৌঁছে দিয়েছিল। পরে তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। একই সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হয়ে একটি খসড়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তি তৈরি করে আইএনএসএসিওজি।

রয়টার্সের হাতে ওই খসড়া বিজ্ঞপ্তির একটি কপি রয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, মহারাষ্ট্র থেকে সংগ্রহ করা ১৫ থেকে ২০ শতাংশ নমুনায় করোনার নতুন শনাক্ত হওয়া ভারতীয় ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দুটি রূপ বদলের (মিউটেশন) প্রমাণ মিলেছে। এটা অতি সংক্রামক ও খুবই উদ্বেগজনক।

মানুষ বিজ্ঞানীদের চেয়ে রাজনীতিকদের কথা বেশি শোনে। আমরা এখন খুবই মারাত্মক পরিস্থিতিতে আছি।
শান্তা দত্ত, ভারতের বিজ্ঞানী ভারতীয় বিজ্ঞানীদের এ উদ্ভাবনের বিষয় মোদি সরকার প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে দুই সপ্তাহ পরে, ২৪ মার্চ। তবে এই সময় প্রকাশিত সরকারি বিবৃতিতে ‘উচ্চ উদ্বেগের’ বিষয়টি বলা হয়নি।

তবে কেন্দ্র সরকার করোনার পরীক্ষা বাড়ানো ও কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়। রয়টার্স বলছে, সংক্রমণ রোধে বিশেষজ্ঞরা এপ্রিলের শুরু থেকেই ভারতজুড়ে লকডাউন আরোপের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে অন্তত চারজন বিজ্ঞানী বলেছেন, ভারত সরকার তাঁদের সেই আহ্বান শোনেনি।

উল্টো লাখ লাখ মানুষের মাস্ক না পরে, সামাজিক দূরত্ব না মেনে ধর্মীয় উৎসবে যোগ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে বিজেপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের জনসভায় হাজারো মানুষের সমাগম দেখা গেছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী মোদি হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে নির্বাচনী সভা করেছেন।

দিল্লির চারপাশে দশ হাজারের বেশি কৃষক ক্যাম্প করে মোদি সরকারের কৃষি আইন পরিবর্তনের দাবিতে অবস্থান করেছিলেন। শয্যা না থাকায় ফিরিয়ে দিয়েছে হাসপাতাল। অটোরিকশায় বসেই অক্সিজেন চলছে কোভিড-১৯ রোগীর। ২৮ এপ্রিল, ভারতের আহমেদাবাদে
শয্যা না থাকায় ফিরিয়ে দিয়েছে হাসপাতাল।

অটোরিকশায় বসেই অক্সিজেন চলছে কোভিড-১৯ রোগীর। ২৮ এপ্রিল, ভারতের আহমেদাবাদেছবি: রয়টার্স। এসব ঘটনা ভারতজুড়ে করোনা সংক্রমণ ছড়াতে ভূমিকা রেখেছে। ভারতে গতকাল শুক্রবার রেকর্ড চার লাখের বেশি মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মহামারির শুরু থেকে বিশ্বজুড়ে কোনো দেশে এক দিনে এত মানুষ আক্রান্ত হয়নি।

এর আগে টানা নয় দিন ধরে দেশটিতে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা ছিল তিন লাখের বেশি। গত ২৪ ঘণ্টায় ভারতে ৩ হাজার ৫২৩ জন করোনায় মারা গেছেন।
এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে করোনায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৮৫৩ জনে। মোট রোগী শনাক্তের সংখ্যা ১ কোটি ৯১ লাখ ছাড়িয়েছে। এ তথ্য ওয়ার্ল্ডোমিটার্সের।

করোনা সংক্রমণ শনাক্তে বিশ্বে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের পরেই দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। আর মৃত্যুতে দেশটির অবস্থান চতুর্থ শীর্ষে। আইএনএসএসিওজির সায়েন্টিফিক অ্যাডভাইজরি গ্রুপের চেয়ার শহীদ জামেল বলেন, ‘ওইসময় ভারত সরকার করোনা সংক্রমণ রোধে নীতি প্রণয়নে বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণের ওপর জোর কম দিয়েছিল।

এটা নিয়ে আমি বেশ উদ্বিগ্ন ছিলাম। নীতি তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে হওয়া উচিত, অন্য কোনো কিছুর ভিত্তিতে নয়। বিজ্ঞানী হিসেবে আমাদের কাজ ছিল তথ্য-প্রমাণ হাজির করে সরকারকে সুপারিশ করা। আমরা সেটা করেছি। কার্যকর নীতি প্রণয়নের দায়িত্ব সরকার, আইনপ্রণেতা ও আমলাদের।’

নর্দার্ন ইন্ডিয়া রিসার্চ সেন্টারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মার্চের শুরুতে বিজ্ঞানীদের সংগ্রহ করা যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ ও সুপারিশ ভারতের কেবিনেট সচিব রাজিব গুবের কাছে পাঠানো হয়েছিল। তাঁর সরাসরি প্রধানমন্ত্রী মোদিকে এসব জানানো দায়িত্ব ছিল। তবে মোদি এসব জানতেন কিনা সেটা নিয়ে নিশ্চিত নন কেউ। রয়টার্সের পক্ষ থেকে বিষয়টি জানতে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিক্রিয়া জানায়নি রাজিব গুবে ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর।

তবে ভারতের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োমেডিকেল জেনোমিক্সের পরিচালক সৌমিত্র দাস বলছেন, ‘করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের বিষয়ে শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দোষারোপ করার সুযোগ নেই। কেননা, এখন সংক্রমণ যে হারে ছড়াচ্ছে, তা অনেক বিজ্ঞানীও অনুমান করতে পারেননি।

এদিকে রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এনসিডিসির পরিচালক সুজিত কুমার সিং গত ১৯ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটির একটি অনলাইন আয়োজনে ‘এপ্রিলের শুরু থেকে কঠোর লকডাউন জারি করা প্রয়োজন ছিল’ বলে মন্তব্য করেছেন। এর আগে ১৫ এপ্রিল বৈঠকে বসেছিল কোভিড-১৯ বিষয়ক ভারতের জাতীয় টাস্কফোর্স।

এ কমিটিতে ২১ জন বিশেষজ্ঞ ও সরকারি কর্মকর্তা রয়েছেন। সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন করোনাবিষয়ক ভারতের প্রধানমন্ত্রীর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ভি কে পাল। বৈঠকে অংশ নেওয়া একজন বিশেষজ্ঞ রয়টার্সকে জানিয়েছেন, করোনা সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ বলে টাস্কফোর্স সদস্যরা একমত হয়েছেন।

সংক্রমণে লাগাম টানতে দেশজুড়ে লকডাউন আরোপের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে সরকারের সময় নেওয়া উচিত হবে না বলেও মনে করছে টাস্কফোর্স। আমাদের বিজ্ঞানীরা বেশ ভালো কাজ করেছিলেন। কিন্তু সময় মতো তাদের সুপারিশ মানেনি কেন্দ্রীয় সরকার। এখন কয়েকটি রাজ্য ঠিক সেই পথে হাটতে বাধ্য হচ্ছে।

রাকেশ মিশ্র, ভারতের সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজির পরিচালক তবে গত ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি লকডাউন আরোপের বিপক্ষে তাঁর অবস্থানের কথা জানিয়ে দেন। তিনি বলেন, করোনার বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ের সর্বশেষ অস্ত্র হওয়া উচিত লকডাউন। এক বছর আগেই ভারত টানা দুই মাসের লকডাউনের ভেতর দিয়ে গেছে।

ওই সময় লাখো মানুষ কাজ হারিয়েছেন। সংকটে পড়েছে অর্থনীতি। ওই অভিজ্ঞতা মানুষ এখনো ভোলেনি। পিপিই পরে কোভিড-১৯ রোগীর সেবা করছেন একজন স্বাস্থ্যকর্মী। ১ মে, দিল্লির একটি হাসপাতালে পিপিই পরে কোভিড-১৯ রোগীর সেবা করছেন একজন স্বাস্থ্যকর্মী।

মোদি লকডাউনকে ‘সবশেষ বিকল্প’ হিসেবে বিবেচনা করার জন্য রাজ্য সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নতুন করে যাতে লকডাউন আরোপ করতে না হয়, সে জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। এর বদলে স্বল্প পরিসরে ও স্থানীয় পর্যায়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে মোদির এসব পরামর্শ খুব একটা কাজে লাগছে বলে মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা।

ভারতে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা সেটাই বলছে। মহারাষ্ট্র ভারতের দ্বিতীয় জনবহুল রাজ্য। করোনা সংক্রমণ রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় সেখানকার হাসপাতালগুলোয় শয্যা ও অক্সিজেনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গত ১৪ এপ্রিল থেকে মুম্বাইসহ পুরো মহারাষ্ট্রে লকডাউন আরোপ করেছে রাজ্য সরকার।

ভারতের সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজির পরিচালক রাকেশ মিশ্র আইএনএসএসিওজির সদস্য। তিনি বলেন, ‘আমাদের বিজ্ঞানীরা বেশ ভালো কাজ করেছিলেন। কিন্তু সময় মতো তাদের সুপারিশ মানেনি কেন্দ্রীয় সরকার। এখন কয়েকটি রাজ্য ঠিক সেই পথে হাটতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ইনস্টিটিউট অব কলেরা অ্যান্ড এন্টেরিক ডিজিজেসের বিজ্ঞানী শান্তা দত্ত আক্ষেপ করে বলেন, মানুষ বিজ্ঞানীদের চেয়ে রাজনীতিকদের কথা বেশি শোনে।

আমরা এখন খুবই মারাত্মক পরিস্থিতিতে আছি।’ গত ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি লকডাউন আরোপের বিপক্ষে তাঁর অবস্থানের কথা জানিয়ে দেন। তিনি বলেন, করোনার বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ের সর্বশেষ অস্ত্র হওয়া উচিত লকডাউন। এক বছর আগেই ভারত টানা দুই মাসের লকডাউনের ভেতর দিয়ে গেছে। ওই সময় লাখো মানুষ কাজ হারিয়েছেন। সংকটে পড়েছে অর্থনীতি। ওই অভিজ্ঞতা মানুষ এখনো ভোলেনি।

২০১৪ সালে ভারতে ক্ষমতায় আসেন নরেন্দ্র মোদি। এর পর থেকে তিনি সীমান্ত সমস্যা, নাগরিকত্ব আইন নিয়ে বিক্ষোভ, কৃষক আন্দোলনসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন। তবে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ মোদি ও ভারতকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। ২০২৪ সালের পরবর্তী নির্বাচনে এ সংকটের প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

ভারতে শনাক্ত হওয়া করোনার অতি সংক্রামক ধরন সংকট তৈরি করতে পারে পুরো বিশ্বে। কেননা এরই মধ্যে যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, ইরানসহ বিশ্বের অন্তত ১৭টি দেশে করোনার ভারতীয় ধরন ছড়িয়ে পড়ার খবর মিলেছে। বাংলাদেশসহ অনেক দেশ ভারতের সঙ্গে সীমান্ত ও আকাশ পথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে।