ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ

আন্তর্জাতিক

আরও জটিল আকার ধারণ করেছে ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি। মঙ্গলবারও (১১ মে) একাধিকবার আক্রমণ চালিয়েছে ইসরাইল। এতে নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি অনেকে আহত হয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাড়িঘর, স্থাপনা। পাল্টা হামলা চালিয়েছে স্বাধীনতার সপক্ষের সংগঠন হামাস। ফিলিস্তিনিদের ওপর সোমবারের বিমান হামলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৮ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত দেড় শতাধিক, এর মধ্যে অনেকে হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন।

দখলদার ইসরাইল যে কতটা বর্বর তার সাক্ষ্য দিচ্ছে শিশুদের কান্না। মঙ্গলবার ফিলিস্তিনিদের বসতি লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায় ইসরাইলি বাহিনী। এতে আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বহু স্থাপনা। জ্বলছে বেশ কিছু এলাকা। রকেট হামলা চালিয়ে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা চালিয়েছে, ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। ইসরাইল দাবি করেছে, এতে তাদের দুজন নিহত হয়েছে।

সোমবার (১০ মে) ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো ইসরাইলের একপেশে হামলায়, নিহত বেশ কয়েকজনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রমজানে রোজা রেখে শত শত মানুষ মরদেহ নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রতিজ্ঞা করেন। ইসরাইলের এই দমনপীড়ন এখনও চলছে। ফিলিস্তিনিদের দমাতে তারা অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

পবিত্র আল আকসা প্রাঙ্গণ দখলে নিয়েছে দখলদাররা। এ অবস্থায় হামাসকে ধ্বংস করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বিনইয়ামিন নেতানিয়াহু। দখলদারদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। সহিংসতার জন্য উল্টো হামাসকেই দুষছে তারা।

‘হামাগুড়ি দিয়ে হলেও আমরা পৌঁছাবো ইনশাআল্লাহ’

মসজিদুল আকসা বা বাইতুল মুকাদ্দাসের ইতিহাস নিয়ে বর্তমান সময়ের আলোচিত ইসলামী বক্তা মিজানুর রহমান আজহারী তার ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সেখানে তিনি ইতিহাসের পাতা থেকে বাইতুল মুকাদ্দাসের সাথে মুসলমানদের যে সম্পর্ক রয়েছে তা তুলে ধরেছেন।

জার্নালের পাঠকদের জন্য মিজানুর রহমান আজহারীর স্ট্যাটাসটি তুলে ধরা হলো-

‘মসজিদুল আকসা বা বাইতুল মুকাদ্দাস ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম মসজিদ। যেটি জেরুসালেমের পুরনো শহরে অবস্থিত। এটা মুসলমানদের কাছে ‘বায়তুল মোকাদ্দাস বা ‘আল আকসা’ মসজিদ নামে পরিচিত। ইসলামি স্থাপনার প্রাচীন এই নমুনাটি মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদি তিন ধর্মাবলম্বীদের কাছে সমানভাবে পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ।

ঈসা আ: ও মরিয়ম আ:-এর সাথে প্রাচীনতম ইবাদতঘর বায়তুল মুকাদ্দাস বা মসজিদে আকসার সম্পর্ক সুনিবিড়ভাবে জড়িত। মুসলিমদের কাছে আল আকসা মসজিদ নামে পরিচিত স্থাপনাটি ইহুদিদের কাছে ‘টেম্পল মাউন্ট’ নামে পরিচিত। আল আকসা হচ্ছে-ইসলামের প্রথম কেবলা এবং মক্কা ও মদিনার পর তৃতীয় পবিত্র স্থান।

মসজিদুল আকসায় এক রাকাত নামাজ আদায় করলে ২৫০ অন্য বর্ণনায় ৫০০ রাকাতের সাওয়াব পাওয়া যায়। শেষ জামানার ঘটনাবলির কারণেও এ এলাকাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলেই দাজ্জাল ও ঈসা আ:-এর আগমন ঘটবে। বিশ্বনবী সা: মিরাজের রাতে মসজিদুল হারাম থেকে আল-আকসা মসজিদে এসেছিলেন এবং এখান থেকেই তিনি ঊর্ধ্বাকাশের দিকে যাত্রা করেন।

বিশ্বনবী সা: মিরাজ গমনের শুরুতে এই মসজিদে সব নবি–রাসুলের ইমামতি করে নামাজ আদায় করেন। এতে তিনি ‘ইমামুল আম্বিয়া’ অর্থাৎ সকল নবির ইমাম ও ‘সায়্যিদুল মুরসালিন’ তথা সব রাসুলের নেতা হিসেবে স্বীকৃত হন। এ এলাকাটি অসংখ্য নবি–রাসুলের স্মৃতিবিজড়িত, এর আশপাশে অনেক নবি-রাসুলের কবর রয়েছে।

প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চলটি ওহি অবতরণের স্থল, ইসলামের কেন্দ্র, ইসলামি সংস্কৃতির চারণভূমি ও ইসলাম প্রচারের লালনক্ষেত্র হিসেবে প্রসিদ্ধ। আল আকসা মসজিদের গুরুত্বের আরো একটি বড় কারণ হলো, রাসুল সা: নবুয়ত প্রাপ্তির পর থেকে টানা ১৪ বছর পর্যন্ত আকসা মসজিদই ছিল মুসলিমদের কিবলা।

মক্কায় যখন রাসুল সা: নামাজ পড়তেন তখন বায়তুল মোকাদ্দাস অভিমুখী হয়ে দাঁড়ালেও ক্বাবাকে তিনি সামনে রাখতেন। হিজরতের ১৬ থেকে ১৭ মাস পর মহান আল্লাহর নির্দেশে মুসলমানদের কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাস থেকে মক্কার দিকে স্থায়ীভাবে পরিবর্তন হয়।

বিশুদ্ধ মতানুসারে সর্ব প্রথম আদম আ: মসজিদুল আকসার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। ইমাম কুরতুবির মতে, এই মসজিদটি প্রথম নির্মাণ করেন আদম আ:-এর কোনো এক সন্তান। ইবনে হাজার আল-আস্কালানি নূহ আ-এর সন্তান সাম-এর কথাও উল্লেখ করেছেন।

পরে এই মসজিদটি পুনঃনির্মাণ করেছিলেন ইব্রাহিম আ-এর ছেলে নবি ইসহাক আ: ও পরিপূর্ণ করেছিলেন নবি সুলাইমান আ:। বনি ইসরাইলের ধার্মিক লোকজন এই বায়তুল মুকাদ্দাস বা মসজিদুল আকসায় আল্লাহ তা’আলার উপাসনায় মগ্ন থাকতেন।

ইতিহাসের সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমা শেষে খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাবের আমলে জেরুসালেম বিজয় হলে বর্তমান মসজিদের স্থানে তিনি একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। পরে উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিকের যুগে মসজিদটি পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারিত হয়।

৭৪৬ খ্রিস্টাব্দে ভূমিকম্পে মসজিদটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে আব্বাসীয় খলিফা আল মনসুর এটি পুনর্নির্মাণ করেন। পরে খলিফা আল-মাহদি-এর পুনর্নির্মাণ করেন। ১০৩৩ খৃস্টাব্দে আরেকটি ভূমিকম্পে মসজিদটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ফাতিমি খলিফা আলি আজ-জাহির পুনরায় মসজিদটি নির্মাণ করেন, যা অদ্যবধি টিকে আছে।

১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে ক্রুসেডাররা জেরুজালেম দখল করার পর তারা মসজিদটিকে একটি প্রাসাদ এবং মসজিদ প্রাঙ্গণে অবস্থিত কুব্বাতুস সাখরাকে গির্জা হিসেবে ব্যবহার করত। মুসলিম বীর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি জেরুসালেম পুনরায় জয় করার পর মসজিদ হিসেবে এর ব্যবহার পুনরায় শুরু হয়।

আইয়ুবি, মামলুক, উসমানি, সুপ্রিম মুসলিম কাউন্সিল ও জর্ডানের তত্ত্বাবধানে এর নানাবিধ সংস্কার করা হয়।বর্তমানে পুরনো শহরটি ইসরায়েলিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ইসলামের তৃতীয় বৃহত্তম ঐতিহাসিক এ মসজিদটির ওপর চলছে যায়োনিস্ট ইহুদিদের আগ্রাসন। অবৈধভাবে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র ইসরায়েল ১৯৬৭ সালে ‘মসজিদুল আকসা’ জবরদখল করে নেয়।

এরপর থেকে সেখানকার মুসলিম জনগণ মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য তাদের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জায়ানবাদী ইসরাইল একের পর এক মুসলিম–অধ্যুষিত এলাকা জবরদখল করে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখে। বর্তমানে এ মসজিদে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত।

ইসরাইলের মুসলিম বাসিন্দা এবং পূর্ব জেরুজালেমে বসবাসরত ফিলিস্তিনিরা মসজিদুল আকসায় প্রবেশ ও নামাজ আদায় করতে পারে। আবার অনেক সময় তাদের বাধাও দেয়া হয়। এই বিধিনিষেধের মাত্রা সময়ে সময়ে পরিবর্তন হয়। কখনো শুধু জুমার নামাজের সময় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। গাজার অধিবাসীদের জন্য বিধিনিষেধ অনেক বেশি কঠোর।

আমরা মহান আল্লাহ তা’আলার দরবারে কায়মনোবাক্যে ফরিয়াদ জানাই, তিনি যেন আবারো আমাদেরকে কুদস বিজয়ের তাওফিক দেন এবং মসজিদুল আকসা পুনরুদ্ধার করার হিম্মত নসিব করেন। (‘ম্যাসেজ’ বই থেকে, পৃষ্ঠা : ২৪৪-২৪৬ দ্বিতীয় সংস্করণ)।’