এখন আমার কি চঞ্চল দাদার মত অনুভূতিতে আঘাত পাওয়া উচিত : রিতু কুন্ডু

অন্যান্য

তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব (কম্পারেটিভ রিলিজিয়ন) নিয়ে দীর্ঘ ২৯ বছর গবেষণার পর ইসলাম গ্রহণ করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) লোকপ্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রিতু কুন্ডু। তিনি তার ফেসবুকে লিখছেন, “এই যে দাদা দিদিরা আমার পোস্টে হাহা দিয়েই যাচ্ছে দিয়েই যাচ্ছে, কমেন্ট অপশন খোলা নাই দেখে সাম্প্রদায়িক কমেন্ট করতে পারলো না, এখন আমার কি চঞ্চল দাদার মত অনুভূতিতে আঘাত পাওয়া উচিত।”

শান্তির এ ধর্মে তিনি দিক্ষিত হয়েছিলেন বছর চারেক আগে। তবে বিষয়টি এতদিন ওইভাবে জানাজানি হয়নি।উল্লেখ্য বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী বিশ্ব মা দিবসে তার ভেরিফাইড ফেসবুক পাতায় তার মায়ের সাথে তোলা একটা ছবি পোষ্ট করেছিলেন। এর পর থেকেই ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে।

ছবিতে তার মাকে দেখা যাচ্ছে মাথায় সিঁদুর, হাতে শাঁখা-পলা পরা। অনেকেই ফেসবুকে লিখেছেন অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীর ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে ছবির পোস্টটিতে কটুক্তি করা হয়েছে। আবার অনেকেই লিখেছেন হাজার হাজার মন্তব্য মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি খারাপ মন্তব্য থাকলেই বাকি সবাই ভালো মন্তব্য করেছেন।

চঞ্চল চৌধুরীর মায়ের সাথে দেয়া ছবির পোস্টটিতে চঞ্চল চৌধুরীর মায়ের সাথে দেয়া ছবির পোস্টটিতে ইতিবাচক React ৯৯.৯১% আর নেতিবাচক React ০.০৮৫%। দেখা যায় মোট ২ লাখ ৫৬ হাজার রিয়্যাকশনের মধ্যে ১ লাখ ৩৯ হাজার লাভ রিয়্যাকশন, ১ লাখ ১০ হাজার লাইক রিয়্যাকশন, ৬ হাজার কেয়ারিং রিয়্যাকশন, ৩৯১ ওয়াউ রিয়্যাকশন, ১৯০ হাহা রিয়্যাকশন, ৫৭ স্যাড রিয়্যাকশন এবং ২৮ অ্যাংরি রিয়্যাকশন। মোট মন্তব্য ছিল ১৮ হাজার।

Chanchal Chowdhury নিজেই তার পোস্টে মন্তব্যের ঘরে লিখেছেন,
“ভ্রাতা ও ভগ্নিগন…
আমি হিন্দু নাকি মুসলিম, তাতে আপনাদের লাভ বা ক্ষতি কি??? সকলেরই সবচেয়ে বড় পরিচয় ‘মানুষ’।
ধর্ম নিয়ে এসকল রুচিহীন প্রশ্ন ও বিব্রতকর আলোচনা সকল ক্ষেত্রে বন্ধ হোক…
আসুন,সবাই মানুষ হই”

রিতু কুন্ডু তার ফেসবুকে লিখছেন, “আমি লাইক কমেন্টের আশায় লিখি না। স্বস্তা জনপ্রিয়তার আশায়ও লিখি না। যারা লাইক কমেন্টের আশা করে তারা শিল্পা শেঠঠির আদলে ঘন ঘন ছবি দেয়, লেখে না। যখন ২৫-৩০ লাইক ছিল তখনও আমি লিখিতামই। তাহলে আমি কেন লিখি???

প্রথমত, লেখালেখি আমার ছোটবেলার অভ্যাস। আগে ডায়েরি লিখতাম, এখন ফেসবুকে লিখি। আমি লিখি, কারন লিখতে আমার ভালো লাগে। আমার জ্ঞানে যা আছে, আমি তাই লিখি। অবশ্যই আমার নিজস্ব চিন্তা ভাবনা থেকেই লিখি। ফেসবুকে পোস্ট করার অপশনেই থাকে What’s on your mind. আমি সেখানে আমার মাইন্ডের কথাই লিখি, অন্যের মাইন্ডে কি চলছে তা লেখার সাধ্য কি!!! ইচ্ছাও নাই।

দ্বিতীয়ত, ইসলামকে কবুল করার পর যত ইসলামে দাখিল হয়েছি, ততই বিস্মিত হয়েছি, আর সেই বিশ্বাস লেখায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আগে অনেক লিখেছি, এখন প্রচুর সংখ্যক ফ্রেন্ড থাকায় একটু কম লিখি। ইসলাম নিয়ে লিখি কারন আমার ভালো লাগে।

তৃতীয়ত, আমি ইসলামিক স্কলার না, আমার লেখা পড়ে কেউ ইসলাম শিখবে না, আমি কাউকে পথ দেখাতে পারি না, আমার ইসলামের শরয়ী বিধানে তেমন কোন অভিজ্ঞতাই নেই। তাই আমি সেসব বিষয়ে লিখি না। আমি লিখি ইসলামকে ভালোবাসার কথা, ইসলামের ভালোবাসার কথা।

কিন্তু আমি লিখি কারন আমি জানি যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে, ভালোবাসে, ভয় করে তারা যখন দেখবে মাত্র তিন চার বছর আগের অবিশ্বাসী কাফের যদি আল্লাহকে ভালোবাসে, আল্লাহর বিধান মেনে চলে, আমি বিশ্বাসী কতই না সৌভাগ্যবান যাকে আল্লাহ জন্মই দিয়েছেন হেদায়েতের উপরে, আলহামদুলিল্লাহ। শুধু এই বিশ্বাসীদের জন্যই আমি লিখি।

আল্লাহ তো বলেছেনই, যারা সত্য অস্বীকার করে বিলাসিতায় মজে আছে তাদেরকে অবকাশ দাও, সৌজন্যতার সাথে তাদের পরিহার কর। তাদের ব্যাপারে আমারো তাই কোন আশা নেই। কিন্তু যখন গত বছর ২৯ রমাদ্বানে আমার ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি নিয়ে লিটন চন্দ্র দাস নামের জনৈক এক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চালিয়েছিল।

অশ্লীল অকথ্যভাষায় আমাকে গালাগালি করেছিল পুরো বাহিনী নিয়ে, আমার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটিকে লাভ জি হা দ, মোল্লার পাল্লায় পরে ব্রেইন ওয়াশ, ভবিষ্যতের ধান্দা এসব বলে বলে আমাকে ম্যাসেজ পাঠাচ্ছিল, স্ট্যাটাস দিচ্ছিল, আমার চরিত্রের এনাটমি নিজেদের কুতসিত অন্তর দিয়ে ব্যাখ্যা করছিল, সে সময় থেকে তূলনামূলক বিষয়গুলো একটু বেশি লিখি, যদিও অবশ্যই যৌক্তিকভাবে, কোন বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করে নয়।

কারন ইনিই সর্বপ্রথম বিষয়টা আর আমার ব্যক্তিগত ধর্ম বিশ্বাসে যখন রাখলো না, নিজেদের মনের ঘৃণা দিয়ে তাকে অন্যরূপ দেয়ার চেষ্টা করলো, তখন লেখাটা আমার সেল্ফ ডিফেন্সে অত্যাবশ্যকীয় হয়ে ওঠে। তবুও সর্বসাকুল্যে তিনচারটা লেখা হবে। সে সময়ের প্রত্যেকের কথা আমি মনোযোগ দিয়ে পড়েছি, প্রত্যেকের স্ট্যাটাস, কমেন্ট আমি স্ক্রীনশট দিয়ে রেখেছি, অগণিতকে ব্লক করেছি, জিডি করেছি, পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগের সহায়তায় তখনকার মতো ফেইক আইডিগুলো ডিজএবল করেছি।

(পুলিশ আমাদের সরাসরি সার্ভিস দেয় বলে আমরা, আমি নিজেও তাদের স্বল্প অসহযোগিতায় অনেক বিরক্ত হই, সারাদিন বদনাম করি, কিন্তু দিনশেষে পুলিশদেরকেই পাশে পাই আমরা, এটাও অস্বীকার করি না কখনও।) তো সে সময়ে কটাক্ষকারী, উগ্রবাদী, অশ্লীলভাষী ধর্মান্ধদের বাক্যবাণ থেকে আমি, আমার চরিত্র, আমার শিক্ষাগত অর্জন, আমার মানবিকতা, আমার পরিবার, আমার বাবা মা, আমার স্বামী সন্তান, আমার রাসূল, আমার আল্লাহ কেউই বাদ যায়নি।

ঠিক সেদিনের পর থেকে আমার নিজের জন্যই আমি লিখছি, প্রতিদিন প্রতিক্ষণ লিখছি, কারন ওরা আমাকে টেনে ওদের লেভেলে নামিয়ে এনেছিল, সেটা বন্ধ করতে আমার লেখা অত্যাবশ্যক ছিল। তবে আমি নিজেকে ওদের লেভেলে নামিয়ে লিখি না, আমি লিখি ওদের কুতসিত যুক্তিগুলোকে ধাক্কা দিতে–আমি লাভ জি হা দে পরে আল্লাহকে ভালোবাসি নি, আমি কারও প্ররোচনায় ইসলামে আসিনি,

আমি কচি খুঁকি না যে আমাকে ফুসলিয়ে পালটে দেয়া যায়, আবার আমি ধান্দাবাজ লোভী নারীও না যে অন্যের কাঁধে ভর করে বিলাসিতা করে। আমি সেই নারীদের মাঝে একজন যে বিয়ের সময় বাবা মা বা শ্বশুড়বাড়ি থেকে এক ভরি স্বর্ণও নেয় নি (এত কিছু থাকতে এই উদাহরণ দিলাম কারন স্বর্ণের প্রতি ভালো মেয়েদেরও আকর্ষণ প্রচুর, লোভী হলে তো কথাই নেই),

আমি সেই নারী যে হেটে হেটে পুরো ঢাকাশহর ঘুরতে পারে, ফুটপাত থেকে শপিং করতে পারে, বুয়াদের বাড়িতে বস্তিতে গিয়ে এক থালাতে দাওয়াত খেতে পারে , খালিপায়েও রাস্তায় হাটতে পারে, আমার বিলাসিতার ধরন এমনই। তবে ওরা যে এসব খুউব বুঝবে তা না, কারন যার মনে যা। সকলেই নিজের ভাবনার সমান অন্যকে চিন্তা করে, তারাও তাই। সে সময় থেকেই মূলত লেখার শুরু।

আজকাল ভদ্রবেশীরা আবার ভদ্রভাষায় সেই গত রমাদ্বানের অভদ্রদের চিন্তা বলে যায়। কিন্তু ওরা জানে না আমি কোন কথা নিজে থেকে বলিনি, ওদের জাতভাইয়েরাই আমাকে বাধ্য করেছে তা বলতে যে, না!! তারা যা বলছে তা ভুল!! দুনিয়ার বুকে কোন মানুষের জন্য নয়, ইসলামকে আমি ভালোবেসেছি আল্লাহকে ভালোবেসে। আল্লাহ, সেই মহান স্বত্ত্বার দেয়া জীবন বিধান, রাসূল সা এর পথনির্দেশনাই আমাকে ইসলামে আকৃষ্ট করেছে।

তবে সেই আকৃষ্ট হওয়ার বহু আগেই অন্যরা আমাকে অনাকৃষ্ট করেছে, অযৌক্তিক জীবনযাপন আমাকে সাহায্য করেছে সত্যের দিকে পৌঁছাতে। অন্যগুলোকে অযৌক্তিক লেগেছে বলেই যৌক্তিক ইসলামকে সঠিক লেগেছে। এইটাই একমাত্র কারণ। বাকীগুলো তোমাদের মস্তিস্কের বানোয়াট কল্পকাহিনী মাত্র। ইট মেরেছো সবাই মিলে গত রমাদ্বানে পাটকেল তো খেতেই হবে সেই তাহাদের সনে”

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও আপলোড করে নিজের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার কথা বর্ণনা করেন এ শিক্ষিকা। ভিডিওবার্তায় এই শিক্ষিকা বলেন, ‘দীর্ঘ ২৯ বছরের বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা ও জ্ঞান-বুদ্ধির আলোকে আমি ইসলামের বিষয়ে এক মাসব্যাপী পড়াশোনা শুরু করি। ১৬ দিনের মধ্যেই আমি সত্য উপলব্ধি করি এবং ২০১৭ সালের মার্চে ইসলাম গ্রহণ করি।

এই দীর্ঘ ২৯ বছর পর্যন্ত আমি নিজের পরিবার, সমাজ ও মানুষের আচার-ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করি। এ দীর্ঘ সময় অন্যান্য প্রধান সব ধর্মের গ্রন্থাবলি পাঠ করেছি। জাপানেও এ বিষয়ে পড়াশোনা করি। ২০১২ সালে এসে বুঝতে পারি, এগুলো মানুষ রচিত বই (ঐশী বাণী নয়)।’

তিনি যোগ করেন, ‘দীর্ঘ ২৯ বছর পর আমি পবিত্র কোরআনের বাংলা অনুবাদ নিয়ে পড়ালেখা করি। এর পাশাপাশি আমি হাদিসও পাঠ করি। সামনে কোরআনের যে সূরা আর হাদিস পেয়েছি তাই মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। মহান আল্লাহর নির্দেশনার কারণ ও বিধি-নিষেধ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করি। কখনও এ বিষয়ে স্বপ্নও দেখেছি। তা হয়ত অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হবে।’ তিনি যোগ করেন, ‘খুব ছোট থেকেই হয়ত আল্লাহ আমাকে ইসলাম কবুলের জন্য তৈরি করেছিলেন।

ছোট থেকে আজ পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি ঘটনা, শিক্ষা, প্রতিবন্ধকতা আর সমাজের অসংগতি আমাকে ধীরে ধীরে ইসলামের পথে পরিচালিত করেছে। আমি যখন বুঝতে পারলাম, আমাকে নামাজ পড়তে হবে সেদিন থেকে টানা ১৪ মাস আমার নামাজ কাযা হয়নি। এরপর চাকরির কারণে দু-একবার কাযা হয়ে যায়। আমি যখন অনুভব করলাম, আমাকে পর্দা করতে হবে সেদিন থেকে আমি হিজাব পরা শুরু করি।’

পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবের বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণের সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলেন বলেও জানান এ শিক্ষিকা। বলেন, ‘আমার পরিবার ও বন্ধুরা আমাকে এমনটি করতে মানা করে। কিন্তু আমি তাদেরকে বলি, আমি রাসুল (সা.)-কে ভালোবাসতে পেরেছি। আমি বুঝতে পেরেছি, তিনি কেন আমাদের এত সুন্দর সুন্দর উপদেশ ও নির্দেশনা দিয়েছেন। আজ থেকে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করলাম।’