সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ আল কুরআন

পাঠক কলম

বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মহিমান্বিত মহাগ্রন্থ আল-কুরআন বিশ্ব মানবতার জন্য মহান রবের অসী অনুগ্রহ ও অমূল্য অবদান। এ গ্রন্থ বিভিন্ন দিক বিবেচনায় শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছে। অন্যান্য আসমানী কিতাবের দিকে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাবো, সেগুলো কোন নির্দিষ্ট গোত্র বা জাতির জনগোষ্ঠীর উপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং পরবর্তীকালে তাতে বিকৃতিও ঘটেছে।

কিন্তু পবিত্র কুরআন কালের প্রেক্ষাপটে, সময়ের প্রয়োজনে ও সমসাময়িক অবস্থার আলোকে গোটা বিশ্ববাসীর জন্য মহানবীর (সা.) উপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং আজও মানবজাতির মুক্তির একমাত্র গ্যারান্টি হিসেবে অবিকৃত অবস্থায় বিশ্বের মাঝে বিদ্যমান রয়েছে। আল- কুরআনের শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম কয়েকটি দিক হলো :

১. সন্দেহ-সংশয়মুক্ত নির্ভুল গ্রন্থ : যেকোন গ্রন্থে সন্দেহ-সংশয়, ভুল থাকা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু আল-কুরআন এমন এক গ্রন্থ যার মধ্যে সন্দেহ-সংশয় বা ভুলের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। এ কারণেই আল-কুরআনের দৃপ্ত ঘোষণায় এসেছে- ‘‘এ সেই কিতাব যাতে কোন সন্দেহ নেই’’ (সূরা বাকারাহ-২)

২. বিকৃতিমুক্ত একমাত্র আসমানী গ্রন্থ : আল-কুরআনের শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম প্রধান প্রমাণ হচ্ছে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে মহানবী (সা.) এর উপর নাযিলের প্রায় সাড়ে চৌদ্দশত বছর পরও অবিকৃত অবস্থায় বিদ্যমান রয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত এ গ্রন্থে কোন পরিবর্তন, পরিবর্ধন হবে না। এ প্রসংগে মহান আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করছেন- “আমি স্বয়ং এ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষণ করবো” (সূরা হিজর-৯)

৩. শাশ্বত জীবনবিধান : মহাগ্রন্থ আল-কুরআন মানবজাতির জন্য একমাত্র সর্বজনীন পূর্ণাঙ্গ শাশ্বত জীবনবিধানের নাম। এ গ্রন্থে মানুষের ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, আন্তর্জাতিক জীবনের সকল দিক ও বিভাগের নীতিমালা-বিধি বিধান যথার্থভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন- “আমি আপনার প্রতি এমন গ্রন্থ নাযিল করেছি যা প্রত্যেক বস্তুর সুস্পষ্ট বর্ণনা” (সূরা নাহল-৮৯)

৪. সর্বোৎকৃষ্ট সাহিত্য গ্রন্থ : শ্রেষ্ঠ সাহিত্য গ্রন্থ আল-কুরআন বিশ্বসাহিত্যের এক অতুলনীয় স্থান দখল করে নিয়েছে। কুরআনের বর্ণনাভঙ্গির অতুলনীয়তা, ভাষার সাবলীলতা, ভাবের মাহাত্ম্য, রচনা-রীতির গাম্ভীর্য, প্রকাশশৈলির চমৎকারিত্বে আজও বিশ্বসাহিত্যে সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে আছে। নিঃসন্দেহে আল-কুরআন বিশ্বের সর্বোত্তম সাহিত্য।

৫. উপদেশ সংবলিত জীবন্ত কিতাব : আল-কুরআন নিছক কোন ধর্মগ্রন্থ বা আধ্যাত্মিক জ্ঞান ভান্ডার নয় বরং আল-কুরআন এমন এক গ্রন্থ যাতে ব্যক্তি-পরিবার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গন পর্যন্ত সকল অঙ্গনে মানবজাতির জন্য পথ নির্দেশনা বা গাইড লাইন।

এ গ্রন্থ আদি মানব আদম (আ.) থেকে শুরু করে সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত মহান রাব্বুল আলামীন প্রেরিত সকল নবী ও রাসূলদের সত্যনিষ্ঠা, ধৈর্য, অসাধারণ কর্মতৎপরতা ও রবের উপদেশ সংবলিত জীবন্ত দলিল। মহান আল্লাহ বলেন- “তোয়া-হা, আপনাকে ক্লেশ দেবার জন্য আমি আপনার প্রতি কুরআন নাযিল করিনি, কিন্তু তাদেরই উপদেশের জন্য, যারা ভয় করে” (সূরা তোয়াহা-১-৩)

৬. সত্যের পতাকাবাহী : আল-কুরআন মানুষকে অসত্য, অন্ধকার ও অন্যায় পথ থেকে মুক্ত করে সত্য, ন্যায় ও আলোর পথে পরিচালিত করে। গোটা আরব যখন জাহিলিয়াতের বিভীষিকাময় অন্ধকারে নিমজ্জিত ঠিক এমনি এক মুহূর্তে আল-কুরআন মানুষকে আলোর পথ নির্দেশনা দিয়েছে। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন- “এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন” (সূরা ইবরাহিম-১)

৭. কুরআনের সম্মোহনী শক্তির প্রভাব : কুরআন অবতীর্ণের প্রাক্কালে স্বয়ং কুরআনই আরবের অধিবাসীদেরকে এর সম্মোহনী শক্তিতে সম্মোহিত করেছিল। যার অন্তরকে আল্লাহ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন সেই এ মহাগ্রন্থ আল কুরআনের সম্মোহনী প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছে। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ও ওয়ালীদ ইবনে মুগীরার প্রভাবিত হওয়ার ঘটনাদ্বয় সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, আল-কুরআনের সম্মোহনী শক্তি অত্যন্ত প্রবল ও হৃদয়গ্রাহী।

কুরআনের সম্মোহনী শক্তি সম্পর্কে ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা বলেন- “আল্লাহর কসম! মুহাম্মদের কাছে যা অবতীর্ণ হয় তা অত্যন্ত চমৎকার ও মনোমুগ্ধকর এবং প্রাঞ্জল ভাষায় অবতীর্ণ। যা তার সামনে আসে তাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। এটি বিজয়ী হওয়ার জন্য এসেছে পরাজিত হতে আসেনি।” বর্তমান যুগেও কুরআনের সম্মোহনী শক্তিতে প্রভাবিত হয়ে অগণিত বিধর্মী ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিচ্ছে।

এর সম্মোহনী শক্তির প্রভাব সম্পর্কে ওলিয়ারী বলেন: “The Quran is powerful enough to conguer the hearts” অর্থাৎ “কুরআন মানুষের অন্তর জয়ে পরম আকর্ষণীয় ও মনোরম মোহনীয় শক্তির অধিকারী”। আর এটা আল-কুরআনের শ্রেষ্ঠত্বরই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

৮. শ্রেষ্ঠ অলৌকিক গ্রন্থ : আল কুরআনের অন্যতম শ্রেষ্ঠত্ব ও বৈশিষ্ট্য হলো এর অলৌকিকত্ব। মহানবী (সা.) আল্লাহ তায়ালা অগণিত মু’জিযার পাশাপাশি চিরন্তন মুজিযা হিসেবে আল-কুরআন দান করেছেন। এর অলৌকিকত্ব যেমন তাঁর সমকালীন মানবম-লী প্রত্যক্ষ করেছে এবং স্বীকার করেছে, তেমনি পরবর্তী সকল যুগের আগ্রহী মানুষও তা প্রত্যক্ষ করতে পারছে। হাদিসে এসেছে- আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন “প্রত্যেক নবীকে তাঁর পূর্ববর্তী নবীদের প্রায় অনুরূপ মুজিযা দেয়া হয়েছিল। অতঃপর লোকেরা তাঁর উপর ঈমান এনেছে।

কিন্তু আমাকে: যে মুজিযা দেয়া হয়েছে তা হলো অহী (আল কুরআন), যা আল্লাহ তায়ালা আমার উপর নাযিল করেছেন। আমি আশা করি কিয়ামতের দিবসে তাঁদের অনুসারীদের তুলনায় আমার অনুসারীর সংখ্যা সর্বাধিক হবে।” (বুখারী, হাদিস নং-৪৯৮১, মুসলিম, হাদিস নং-১৫২)

৯.অফুরন্ত জ্ঞানের ভান্ডার : মূলত আল-কুরআনই জ্ঞান ও বিজ্ঞানের মূল আঁধার ও অফুরন্ত ভান্ডার। মানুষের চিন্তার খোরাক ও গবেষণার বিষয়বস্তু এ অমূল্য গ্রন্থেই বিদ্যমান রয়েছে। চৌদ্দশত বছর পরও মানুষ এ মহাগ্রন্থে নতুন নতুন জ্ঞান ও বিজ্ঞানের সন্ধান লাভ করছে। বর্তমান যুগে বিজ্ঞানীগণ মানবদেহ, পৃথিবী, মহাকাশ ইত্যাদি বিষয়ে অনেক তথ্য উদঘাটন করছে।

তারা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেছে যে, কুরআনে এ সকল বিষয়ে অনেক তথ্য রয়েছে যা নব আবিষ্কৃত তথ্যাদির সাথে শতভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ।এভাবে আগত সকল যুগেই মানুষ কুরআনের মধ্যে নতুন নতুন জ্ঞান ও বিজ্ঞানের সন্ধান লাভ করবে। কেউ সেগুলো বিবেচনা করে হৃদয়কে আলোকিত করবেন।

কুরআনের বৈচিত্র্য ও ব্যাপকতা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ড. মরিস বুকাইলি বলেন- “The Quran will be regarded as an academy of science for the scientistic, a lexicon for etymologist, a grammar book for grammarian, a book prosody for poets and encyclopaedia of lows and legislation.”

১০. সর্বাধিক ভাষায় অনূদিত গ্রন্থ : ঐতিহাসিক আমির আলীর ভাষায়- “কুরআন যদি শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ না হতো তাহলে এত অধিক ভাষায় তার অনুবাদ হতো না। কেননা, বর্তমানকাল পর্যন্ত কুরআন প্রায় চল্লিশটির অধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। পৃথিবীর অন্য কোন গ্রন্থ এত অধিক ভাষায় অনূদিত হয়নি”।

১১. সকল আইনের উৎস : মানব জীবনের এমন কোন দিক বা বিভাগ নেই যা মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে আলোচিত হয়নি। ঐতিহাসিক নিকোলসন বলেন: মানব সমাজের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক যত সমস্যা দেখা যায়, তার সঠিক সমাধানের প্রধান উৎস হলো আল-কুরআন।

এতে দেওয়ানী ও ফৌজদারীসহ সকল আইনের আলোচনা স্থান পেয়েছে। “Al Quran is the respell of the religion of Islam.” পবিত্র কালামে হাকীমে বর্ণিত হচ্ছে: “যেসব লোক আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী বিচার ফায়সালা করে না, তারাই কাফের” (সূরা মায়েদা-৪৪)

১২. বিস্ময়কর মহাগ্রস্থ : মহাবিশ্বের এক বিস্ময়কর গ্রন্থের নাম আল-কুরআন। পৃথিবীতে আল-কুরআন ব্যতীত এমন কোন গ্রন্থ খুঁজে পাওয়া যাবে না যা বিশ্বের অগণিত মানুষের স্মৃতিতে সংরক্ষিত আছে। মহানবী (সা.) এর আমল থেকে বিশ্বব্যাপী অসংখ্য হাফেজ নির্ভুলভাবে তাদের স্মৃতিতে কুরআনকে মুখস্থ করে আসছে। মহান সৃষ্টিকর্তা এভাবে তাঁর নিজ ওয়াদা অনুসারে পবিত্র কুরআনকে বিকৃতিমুক্ত করে রেখেছেন।

Leave a Reply