ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে পটুয়াখালীর ১৬ গ্রাম প্লাবিত

আবহাওয়া

ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হয়ে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ থেকে ৪ ফুট উঁচু জোয়ারের পানি প্রবেশ করে ১৬টি গ্রাম পুরোপুরি প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ওই সব গ্রামের প্রায় ১২ হাজার মানুষ।

মঙ্গলবার (২৫ মে) দুপুর পর্যন্ত রাঙ্গাবালী উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের বেড়িবাঁধের বাইরের সব নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলসহ ৭টি গ্রাম ৩ থেকে ৪ ফুট পানিতে প্লাবিত হয়েছে।

আরও পড়ুন: ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে বাগেরহাটে নদী-খালের পানি বৃদ্ধি

এছাড়া চর মোন্তাজ ইউনিয়নের চর আণ্ডার বেড়িবাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় সহস্রাধিক মানুষ। এতে ওইসব এলাকার মানুষের রান্নাবান্নাসহ স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়ে পড়েছে।

বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থাও। কয়েকশ পুকুর ও মাছ চাষের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। রাতের জোয়ারে পানির চাপ আরও বাড়ার শঙ্কায় রয়েছেন ওই এলাকার মানুষ।

আরও পড়ুন: ইয়াসের প্রভাবে পটুয়াখালীতে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি

এদিকে কলাপাড়ার নীলগঞ্জের ইউনিয়নের বিধ্বস্ত নিচকাটা স্লুইস গেট ভেঙে যেকোনো সময় প্লাবিত হতে পারে অন্তত ১২টি গ্রাম। এতে পানিবন্দি হওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন আরও ১২ হাজারেরও বেশি মানুষ।

দুর্গত এসব মানুষের নিরাপদ আশ্রয়সহ খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাঙ্গাবালী ও কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা।

ধেয়ে আসছে শক্তিশালী কালবৈশাখী

আগামীকাল থেকে বুধবার পর্যন্ত দেশব্যাপী কালবৈশাখী হওয়ার পুর্বাভাষ দিয়েছে আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জার্মানি প্রভৃতি দেশের আবহাওয়া পূর্বাভাষের কম্পিউটার মডেল। কালবৈশাখীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বজ্রবিদ্যুৎ, উচ্চ গতিবেগের বাতাস ও শিলাবৃষ্টি।

ঝড় থেকে সৃষ্ট বজ্রবিদ্যুতে বিভিন্ন দেশে মানুষ মারা যায়। তবে বাংলাদেশে এভাবে মৃত্যুর ঘটনা বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেক বেশি। যেমন: আমেরিকায় বজ্রবিদ্যুৎ চমকায় বছরে গড়ে ১৪০ কোটি, মারা যায় গড়ে ৫৯ জন। বাংলাদেশে চমকায় আমেরিকার অর্ধেক, কিন্তু মানুষ মারা যায় আমেরিকার ১০ গুণ বেশি, প্রায় ৫০০ জন।

৪ এপ্রিল একটি কালবৈশাখীতেই গাইবান্ধায় মারা গেছে ১৩ জন (মানবজমিন, ৫ এপ্রিল ২০২১)। আসন্ন কালবৈশাখীতেও মানুষ মারা যাবে।যথাসময়ে কালবৈশাখীর পূর্বাভাষ মানুষের কাছে পৌঁছালে হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব।

১ ঘণ্টা থেকে ৭ দিন আগেই কোনো একটি স্থানের কালবৈশাখীর পূর্বাভাষ দেওয়া সম্ভব। আবহাওয়ার পূর্বাভাষের কম্পিউটার মডেলগুলো ১৫ দিন পরে কোনো স্থানে বৃষ্টি হবে কি হবে না, কিংবা তাপমাত্রা কেমন হবে, তা পূর্বাভাষ দিতে পারে। তিন থেকে পাঁচ দিন পরের আবহাওয়ার পূর্বাভাষ অনেক নির্ভুলভাবেই বলা যায়।

কালবৈশাখীর জন্য চারটি উপাদান দরকার। প্রথমত, ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অত্যধিক বেশি থাকা, যার কারণে ভূপৃষ্টের উপরিভাগের বায়ু গরম হয়ে বায়ুর ঘনত্ব কমে গিয়ে হালকা হয়ে যায়। হালকা বায়ু আকাশে উঠে গিয়ে মেঘের সৃষ্টি করে।

দ্বিতীয়ত, বায়ুতে পর্যাপ্ত পরিমাণে জলীয় বাষ্পের উপস্থিতি থাকা। বায়ুচাপের তারতম্যের কারণে উচ্চ বায়ুচাপযুক্ত স্থানের জলীয় বাষ্প নিম্ন বায়ুচাপযুক্ত স্থানে যায়। এক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলের অনেক জেলার তাপমাত্রাই ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি।

২৫ এপ্রিল যশোর জেলায় প্রায় ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উঠেছিল, যা ১২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই রেকর্ড–ব্রেকিং তাপমাত্রার কারণে ওই সব স্থানের বায়ুর ঘনত্ব কমে গিয়ে আকাশে উঠে যাচ্ছে। ওই জায়গা দখল করতে বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয় বাষ্পযুক্ত বায়ু বাংলাদেশে ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের স্থলভাগে প্রবেশ করা শুরু করেছে।

তৃতীয়ত, প্রাকৃতিক বা যান্ত্রিক বলের উপস্থিতি। এই বল ভূপৃষ্ঠ থেকে জলীয় বাষ্পকে আকাশের অনেক ওপরে নিয়ে গিয়ে মেঘের সৃষ্টি করে। যেমন বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয় বাষ্প বাংলাদেশের স্থলভাগে প্রবেশ করে হিমালয় ও মেঘালয়ের পর্বতমালার ঢাল বেয়ে ওপরে উঠে মেঘের সৃষ্টি করে।

মেঘালয় পর্বতে বাধাপ্রাপ্ত জলীয় বাষ্প থেকে সৃষ্ট মেঘের কারণে সিলেট বিভাগের জেলাগুলোয় বেশি বৃষ্টি হয়।চতুর্থত, কালবৈশাখী দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার জন্য চতুর্থ একটি প্রভাবক দরকার। ভূপৃষ্ঠ থেকে ওপরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বায়ুপ্রবাহের দিক ও মানের পরিবর্তন হওয়া।

যেমন বাংলাদেশে কালবৈশাখী যখন হয়, বেশির ভাগ সময় ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি উচ্চতায় বায়ু সাধারণত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত হয়, ভূপৃষ্ঠ থেকে পাঁচ কিলোমিটার উচ্চতায় বায়ু পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ও প্রায় ১০ কিলোমিটার উঁচুতে উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়।

কালবৈশাখীর সময় উচ্চ আকাশে বায়ু উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হওয়ার কারণে এই ঝড়কে বলে নর্থ-ওয়েস্টার। বিভিন্ন উচ্চতায় বায়ুপ্রবাহের দিকের ভিন্নতার জন্য মেঘের মধ্যে ঘূর্ণন সৃষ্টি হয় এবং কালবৈশাখী দীর্ঘস্থায়ী হয়। এই ঘূর্ণন খুব বেশি হলে টর্নেডো সৃষ্টি হয়।

এই চারটি উপাদান বিশ্লেষণ করে কোনো স্থানের কালবৈশাখীর পূর্বাভাষ দেওয়া যায়। কোনো জেলায় এই চারটি উপাদান দিনের কোন নির্দিষ্ট সময়ে কী পরিমাণে উপস্থিত রয়েছে, জানা যায় আবহাওয়া–সম্পর্কিত কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ ও রাডার থেকে পাওয়া চিত্র বিশ্লেষণ করে। আবহাওয়ার পূর্বাভাষ মডেলের সাহায্যে চারটি উপাদানের পরিমাণ ৭ থেকে ১৫ দিন আগেই জানা যায় ।

বিভিন্ন দেশের একাধিক আবহাওয়া পূর্বাভাষ মডেলের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, ২৭ এপ্রিল থেকেই রংপুর, রাজশাহী ও সিলেট বিভাগের অনেক জেলায় চারটি উপাদানের দু–তিনটির পরিমাণ বাড়া শুরু করেছে এবং ২৯ তারিখ থেকে প্রায় সারা দেশেই চারটি উপাদানের উপস্থিতি দেখা যাবে।

৩০ এপ্রিল থেকে ৫ মে পর্যন্ত সারা দেশেই উপাদানগুলোর উপস্থিতি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার কথা নির্দেশ করছে আবহাওয়ার পূর্বাভাষ মডেল। এ সব কারণে ৩০ এপ্রিল থেকে ৫ মে পর্যন্ত দেশব্যাপী শক্তিশালী কালবৈশাখী ও বজ্রসহ শিলাবৃষ্টির আশঙ্কা খুবই প্রবল।

কালবৈশাখীর আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি রংপুর, সিলেট, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগের জেলাগুলোয়, অন্য জেলাগুলোতেও কালবৈশাখী হবে। একই সময়ে আসাম ও মেঘালয় পর্বত এলাকায় ২০০ থেকে ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনার কথা নির্দেশ করছে আবহাওয়া পূর্বাভাষ মডেলগুলো।

মডেলগুলোর পূর্বাভাষ অনুযায়ী বৃষ্টিপাতের পরিমাণ যদি সত্য হয়, তবে সিলেটের হাওর অঞ্চলে পাহাড়ি ঢল নেমে বন্য পরিস্থিতির সৃষ্টি করার আশঙ্কা রয়েছে।বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর পরিচালিত মৌলভীবাজারের রাডার, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যশোর ও চট্টগ্রামের অবস্থিত রাডার থেকে প্রাপ্ত চিত্র।

জাপানের হিমাওয়ারি ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আবহাওয়া পূর্বাভাষ সংস্থার মেটিওস্যাট নামক কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত চিত্র বিশ্লেষণ করে কোন স্থানের ওপর দিয়ে প্রবাহিত কালবৈশাখীর পূর্বাভাষ প্রতিদিন কমপক্ষে ২ ঘণ্টা থেকে ১০ ঘণ্টা আগে দেওয়া সম্ভব। প্রতিবেশী দেশ ভারতও কালবৈশাখীর পূর্বাভাষ দেয়, ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর কালবৈশাখীর মোবাইল আ্যাপও বানিয়েছে, নাম ‘দামিনী’।

এই মোবাইল অ্যাপ ভারতে কালবৈশাখীর কারণে মৃত্যুর সংখ্যা গত কয়েক বছরে অর্ধেকে নামিয়েছে। একটি দেশের সরকারি আবহাওয়া পূর্বাভাষ সংস্থার প্রধান কাজ হলো সেই দেশের নাগরিকদের সঠিক সময়ে সঠিক আবহাওয়া পূর্বাভাষ দেওয়া। দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার ৫০ বছরে পরেও এই প্রধান কাজটা করতেই ব্যাপকভাবে ব্যর্থ বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর।

প্রতিটা কালবৈশাখীর মৌসুমে, প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ের সময় বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ব্যর্থতার মূল্য দিচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ। নির্দ্বিধায় প্রশ্ন করা